শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, নতুন কী কী থাকছে

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীফাইল ছবি: সংসদ টিভি থেকে নেওয়া

আগামী অর্থবছরের জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশে উন্নীত করে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা এবং জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন অর্থবছরের জন্য মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দের গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে আমরা জাতীয় অগ্রযাত্রার “নিউক্লিয়াস” (মূল কেন্দ্র) হিসেবে বিবেচনা করেছি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতার দ্বারা। তাই বর্তমান সরকার শিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়; বরং জাতীয় পুনর্গঠন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।’

শিক্ষাক্রমে গুরুত্ব, অন্তর্ভুক্ত হবে তৃতীয় ভাষা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাক্রমকে রূপান্তর করছেন, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মানবিক চরিত্রের বিকাশ ঘটে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাক্রমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চান। শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা যেমন জাপানিজ, কোরিয়ান, মান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ইত্যাদি শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার তৃতীয় ভাষা শিক্ষার জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দিচ্ছে।

বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে অনুধাবন, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে ক্লাবভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রম যেমন, বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক এবং প্রান্তিক পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করা হবে। স্কুল-কলেজগুলোয় স্কাউটস, বিএনসিসি (বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর) ও গার্লস গাইডসের কার্যক্রম সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশকে একটি দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালু করা হবে। এর উদ্দেশ্য প্রতিটি শিক্ষার্থী কর্মবাজার উপযোগী অন্তত একটি দক্ষতা—কৃষি, আইসিটি (তথ্যপ্রযুক্তি), বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস, গ্রাফিক ডিজাইন, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা নির্মাণ ও সৃজনশীল শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়।

মেয়েদের জন্য বিনা মূল্যে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা সম্প্রসারণ করার কথাও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে ‘মিড ডে মিল’ সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের স্যানিটেশন ও হাইজিনকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণ, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি স্বতন্ত্র আইডি চালু করা, ডিজিটাল লাইব্রেরির ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস, কোডিং ও ডিজিটাল লিটারেসির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার ব্যবস্থা করা হবে।

‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’

পরিবেশ ও নাগরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সচেতনতা শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি, খাল খনন, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং পোষ্য প্রাণী পালনে উৎসাহ দেওয়া নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া শক্তিশালী ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ’ গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এপ্রেনটিসশিপ ও ইন্টার্নশিপ সুবিধা পাবে এবং স্টার্ট-আপ চালু করা ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

‘ব্রেইন ড্রেইন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদেশে বসবাসরত বৈশ্বিক জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থা, স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, সামার স্কুল, ভিজিটিং স্কলার উদ্যোগ এবং যৌথ গবেষণা কার্যক্রম চালু করা হবে, যাতে দেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।

মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু, উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং ডিজিটাল শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা এমন আগামীর প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা কেবল নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়বে না, বরং সমাজ ও দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে। যারা কেবল সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে; যারা সময়ের অনুসারী নয়, বরং পরিবর্তনের নেতৃত্বে দেবে।’