বাংলাদেশ জ্বালানি ও প্রবাসী আয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিতে

সাংহাই ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (এসআইআইএস) মিডল ইস্ট স্টাডিজের পরিচালক জিন লিয়াংশিয়াং ‘দ্য ইরান–ইউএস কনফ্লিক্ট অ্যান্ড দ্য ইমার্জিং সিকিউরিটি ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক বক্তৃতা করেন। ঢাকা, ২৪ জুলাইছবি: মীর হোসেন

ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া সংকটের ফলে বিশ্বের উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত আর উদীয়মান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অনেক বেশিতে ঝুঁকিতে আছে। কারণ, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানি করে। আবার উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদেশগুলোতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী কাজ করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

চীনের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাংহাই ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (এসআইআইএস) মিডল ইস্ট স্টাডিজের পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ ফেলো জিন লিয়াংশিয়াং এমন মন্তব্য করেছেন। আজ শুক্রবার ঢাকায় ‘বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৬’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম দিনে ‘দ্য ইরান–ইউএস কনফ্লিক্ট অ্যান্ড দ্য ইমার্জিং সিকিউরিটি ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক বক্তৃতা করেন তিনি। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (ডায়রা) এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে।

দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিনে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, গণমাধ্যমের অধিকার ও দায়িত্ব, নৃশংসতার ঝুঁকি ও প্রতিরোধ কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনা হয়েছে আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিপ্লব-পরবর্তী ইতিহাস ও রাজনীতি, দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ও কর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে বিশেষ স্মৃতিচারণা ও ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়েও।

চীনের গবেষক জিন লিয়াংশিয়াং প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্যে বিশ্বকে প্রায় পর্যুদস্ত করা ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং এর প্রভাব উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে জিসিসি দেশগুলোর অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেল সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক দক্ষিণের এমন একটি দেশ বাংলাদেশ, যার অর্থনীতি চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের মতো দেশের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার দিক থেকেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বেশি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

চীনের ওই গবেষকের মতে, জ্বালানির পাশাপাশি বাংলাদেশের ঝুঁকির অন্যতম কারণ জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মীর উপস্থিতি। তাঁদের পাঠানো প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিসিসি দেশগুলোর অর্থনীতি গুরুতর সংকটে পড়লে, এই দেশগুলোতে এই প্রবাসীরা কাজ হারাতে পারেন।

জিন লিয়াংশিয়াং বলেন, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সম্ভাব্য ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও বড় বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে ইরান যুদ্ধ।

ইরান সহজেই ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করে লিয়াংশিয়াং বলেন, ইরান সামরিক সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্যভাবে আত্মনির্ভরশীল, যা দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা দিয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক নিরাপত্তা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিভ রস ‘মিয়ানমার অ্যাট ক্রসরোডস কনফ্লিক্ট, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রিজিওনাল ফিউচার’ শীর্ষক বক্তৃতা করেন। ঢাকা, ২৪ জুলাই
ছবি: মীর হোসেন

অস্বস্তিকর ভারসাম্য রাখতেই হবে

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে অস্বস্তিকর ভারসাম্য বজায় রাখতেই হবে বলে মন্তব্য করেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক নিরাপত্তা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিভ রস। ‘মিয়ানমার অ্যাট ক্রসরোডস কনফ্লিক্ট, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রিজিওনাল ফিউচার’ শীর্ষক নির্ধারিত বক্তৃতায় তিনি বলেন, মিয়ানমারে যুদ্ধবিরতি হলেও সেখানে দেশটিতে আবার সংঘাত শুরুর আশঙ্কা থেকে যায়। তাই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে যদি যুদ্ধবিরতিও হয়, সেটি অনির্দিষ্টকাল টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। যার প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে। তাই বাংলাদেশকে ওই অস্বস্তিকর ভারসাম্য বজায় রাখতেই হবে।

স্টিভ রসের মতে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের সমাধান অত্যন্ত কঠিন। কারণ, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর সামরিক বাহিনীর ওপর আস্থা রাখা সম্ভব নয় এবং তারা আন্তরিক আলোচনায় আগ্রহও দেখায়নি। অন্যদিকে জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও উপলব্ধি করেছে যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের জন্য ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন ওই গবেষক বলেন, মিয়ানমারে সংঘাতের সম্ভাব্য গতিপথ বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। অদূর ভবিষ্যতে মিয়ানমারের সংঘাতের কোনো টেকসই সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এর অর্থ মিয়ানমারকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মনোযোগ ও সম্পদ সামগ্রিকভাবে সংঘাত মোকাবিলার দিকেই কেন্দ্রীভূত থাকবে; রোহিঙ্গা সংকট আলাদাভাবে সেই মাত্রায় গুরুত্ব না–ও পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন কাল শনিবার আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে আন্তসীমান্ত পানি বণ্টন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক সংহতি, আইসিটি আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও টেকসই শান্তি, নেপালের গণতান্ত্রিক যাত্রাসহ আরও কিছু প্রসঙ্গ।