ছাত্র-জনতার বিজয়ের দিন

অভূতপূর্ব গণজাগরণে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্র–জনতার বিজয় উদ্‌যাপন। লাখো মানুষ জড়ো হন জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায়। তাঁদের কারও কারও হাতে ছিল লাল–সবুজের জাতীয় পতাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলেছবি: কবির হোসেন

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেদিন হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পালিয়ে যাওয়ার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তাঁর বোন শেখ রেহানা।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন শেখ হাসিনা। তবে নিজের শাসনামলে কোনো গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন তিনি হতে দেননি। তাঁর পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে টানা সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। বিজয় হয় ছাত্র-জনতার।

সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছিল। আন্দোলনকারীরা সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে দিনটি ছিল ‘শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদের বিলোপের’ এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন। সেদিন ছিল সোমবার, বিপুল জনস্রোতের লক্ষ্য ছিল গণভবন।

৫ আগস্ট সকালেও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। সেদিন ঢাকার সব প্রধান সড়কেই নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা, শাহবাগসহ বিভিন্ন দিক থেকে আসছিলেন ছাত্র-জনতা। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভকারীদের আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। সেদিন দুপুরের আগেই সরকারের বিদায় স্পষ্ট হয়ে যায়।

ছাত্র-জনতার সবার গন্তব্য ছিল গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবন। একপর্যায়ে জনতা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েন।

গণভবনের ভেতরে ঢুকে উল্লাস করেন হাজারো মানুষ। কেউ কেউ গণভবন ও সংসদ ভবন থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যান। সংসদ ভবনে ঢুকেও উল্লাস ও আনন্দমিছিল করেন ছাত্র-জনতা। অনেকের হাতে ছিল লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। বিকেলের দিকে ছাত্র-জনতা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেন। অনেকেই কার্যালয়ের ছাদে উঠে যান।

গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদের দেয়াল এবং বিভিন্ন স্থাপনায় নানা স্লোগান লিখে, ছবি এঁকে ছাত্র-জনতা নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দেয়ালে বিভিন্ন প্রতিবাদী লিখনে উঠে আসে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার শাসনামলের নানা অনিয়ম ও দুঃশাসনের কথা।

জনস্রোত গণভবনে পৌঁছানোর আগেই ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে বেলা আড়াইটায় একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। অথচ ১ আগস্ট তিনি বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা কখনো পালায় না।’

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দিন সকালেও গুলি চলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। ওই দিনও আন্দোলনকারীদের হত্যা করা হয়। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও গুলির ঘটনা ঘটে। এদিন সারা দেশে শতাধিক মানুষ নিহত হন। এর আগের দিনও নিহত হন শতাধিক।

সরকারের গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৪৩। এই সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ জনের মতো হতে পারে বলে জানিয়েছিল জাতিসংঘ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এত বেশিসংখ্যক মৃত্যু হয়নি।

অতীতের মতো জুলাইয়ের আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ দিক ছিল ছাত্রীদের, নারীদের বড় অংশগ্রহণ।

যদিও আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রধান বিচারপতির বাসভবন, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাসভবন সুধা সদনসহ রাজধানীতে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ক্ষমতাচ্যুত মন্ত্রী, দলীয় সংসদ সদস্য ও নেতাদের বাসভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলার ঘটনা ঘটে। হামলা ও আগুন দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও।

সেনাপ্রধানের ভাষণ, সমন্বয়কদের সংবাদ সম্মেলন

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সেনা সদর দপ্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বৈঠকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ছাড়াও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, জাতীয় পার্টির জি এম কাদের, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মুজিবুল হক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মামুনুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী (বর্তমানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী) জোনায়েদ সাকি।

বৈঠকের পর সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘সমস্ত প্রধান প্রধান দলের নেতারা এখানে উপস্থিত ছিলেন। আমি তাঁদের এখানে ইনভাইট করেছিলাম। আমরা একটা সুন্দর আলোচনা করেছি। আমরা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশের সব কার্যক্রম এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বারা পরিচালিত হবে।’

সেনাপ্রধান বলেন, সব হত্যাকাণ্ড ও অন্যায়ের বিচার করা হবে। এ জন্য সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সমস্ত দায়দায়িত্ব নিচ্ছি। আপনাদের জানমাল...এবং আপনাদের আমি কথা দিচ্ছি যে আপনারা আশাহত হবেন না।’

একই সঙ্গে সহিংসতার পথ ছেড়ে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান ও ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান সেনাপ্রধান। তিনি অতি শিগগির ছাত্র-শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলেও জানান।

সেদিন বিকেলে বঙ্গভবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বৈঠকে আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবাইকে ধৈর্য ও সহনশীল আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয়, সে ব্যাপারে বৈঠকে একমত পোষণ করা হয়।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে এবং সম্প্রতি বিভিন্ন মামলায় আটক সব বন্দীকে মুক্তি দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনীর তৎকালীন প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বঙ্গভবনের বৈঠকে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মির্জা আব্বাস, জামায়াতে ইসলামীর শফিকুর রহমান ও এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, জাতীয় পার্টির জি এম কাদের, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মুজিবুল হক, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক, ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম ও আশরাফ আলী আকন, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ূম, জেএসডির শহীদ উদ্দিন মাহমুদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদের শেখ রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

অন্যদিকে ৫ আগস্ট রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। এ সময় সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদার তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-নাগরিকের সমর্থিত বা প্রস্তাবিত সরকার ছাড়া আর কোনো ধরনের সরকারকে সমর্থন করবে না বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেনাসমর্থিত সরকার বা জরুরি অবস্থা দিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার—এ ধরনের কোনো সরকারকে বিপ্লবী ছাত্র-জনতা গ্রহণ করবে না।