শীতে গরম পানি হয়ে উঠছে শিশুদের বিপদের কারণ
১০ মাস বয়সী শিশু রাইয়ান মাহমুদ সন্ধ্যায় বাসায় দৌড়ে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ কিছু একটা পড়ার শব্দে মা মহুয়া আক্তার পেছনে ফিরে দেখেন, রাইস কুকার থেকে গরম পানি পড়েছে ছোট্ট রাইয়ানের গায়ে। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে আছে সে।
গত রোববার থেকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ছেলে রাইয়ানকে নিয়ে আছেন মহুয়া আক্তার। শিশুটির শরীরের প্রায় ৩৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। সে এখন আর হাসি-খেলায় মগ্ন নয়, তার শরীর কাতর জ্বর আর ব্যথায়। তার চারপাশ ঘিরে আছে হাসপাতালের সাদা দেয়াল।
নরসিংদীর একটি ভাড়া বাসায় স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন ২৭ বছর বয়সী মহুয়া। রোববার সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ আসার পর রান্না শুরু করেন তিনি। এ সময় ওই দুর্ঘটনা ঘটে। সেই দিন থেকেই রাইয়ান জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি। সংক্রমণের আশঙ্কায় একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। জ্বর আসছে-যাচ্ছে, উৎকণ্ঠায় কাটছে মায়ের প্রতিটি মুহূর্ত।
মহুয়া আক্তার বলেন, ‘রাইয়ান নয় মাস বয়সে হাঁটা শিখেছে। ওর জন্য কোনো জিনিস নিচে রাখা যায় না। ওই দিন বাসায় সারা দিন কারেন্ট ছিল না। ওর আব্বু ১২ ঘণ্টা ডিউটি করে আসবে, তাই তাড়াহুড়া করতেছিলাম। সন্ধ্যায় কারেন্ট আসায় ভাবলাম, পানি গরম করে বাবুকে গোসল করাব। রাইস কুকারে পানি গরম করছিলাম। সুইচও বন্ধ করছি। কিন্তু কখন যে পেছন থেকে এসে রাইস কুকারের তার টান দিছে, বুঝতেই পারিনি। অর্ধেক গরম পানি ওর গায়ে পড়ে যায়। আমার আর কিছু করার ছিল না।’
শুধু রাইয়ান নয়, এই শীতে তার মতো গরম পানিতে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে আসছে আরও অনেক শিশু। শীত শুরু হওয়ার পর থেকেই এমন দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকেরা।
এই হাসপাতালে ভর্তি আছে মাদারীপুরের দুই বছর বয়সী হুজাইফা। গত শুক্রবার দুপুরে বাড়ির উঠানে সে খেলছিল চাচাতো ভাইবোনের সঙ্গে। গোসলের জন্য গরম পানি উঠানে রাখা ছিল প্লাস্টিকের বড় বালতিতে। খেলতে খেলতে হঠাৎ সেই বালতির ওপর পড়ে যায় সে। মুখ ছাড়া প্রায় পুরো শরীরই ঝলসে গেছে তার।
হুজাইফার মা সাথি আক্তার বলেন, প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয় শিশুটিকে। পরে জেলা হাসপাতাল ঘুরে ঢাকায় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়। এখানে গত শনিবার ভর্তি করা হয় হুজাইফাকে।
এক বছর দুই মাস বয়সী মেয়ে রাহা আক্তার গরম পানিতে দগ্ধ হওয়ায় চিকিৎসার জন্য টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় এসেছেন মা মুন্নি আক্তার ও বাবা রনি তালুকদার।
গত ৩১ ডিসেম্বর রাহা গরম পানিতে দগ্ধ হয়। তার মুখ, হাত ও বুকের একপাশে ঝলসে গেছে। চিকিৎসক অভিভাবকদের জানিয়েছেন, রাহার শরীরের ১৮ শতাংশ দগ্ধ, তবে যতটুকু দগ্ধ, তা ‘ডিপ বার্ন’ (গভীরভাবে দগ্ধ)।
মুন্নি আক্তার বলেন, ‘গোসল করমু, কাপড় ধুমু—এ জন্য চুলায় পানি বসাইছিলাম। গরুরে কয়েল জ্বালায় দিতে গেছি, এর মধ্যে ও খেলতে খেলতে রান্নার জায়গায় আসছে। চুলার কাছেই ওর একটা ছোট চেয়ার আছে, সেখানে বসছে। নামার সময় সম্ভবত একপাশ হয়ে পাতিলের মধ্যে পড়েছে। পরে পাতিল উল্টে গরম পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।’
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন শাওন বিন রহমান বলেন, শীতকালে শিশুদের পুড়ে যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। গত নভেম্বর থেকে এই সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গরম পানি, চা, দুধ বা তরকারি গায়ে পড়ে শিশুরা দগ্ধ হচ্ছে। অভিভাবকেরা রান্নাঘর থেকে গরম জিনিস নিয়ে অন্য ঘরে যাওয়ার সময় অনেক সময় শিশুরা ছোটাছুটি করে কাছে চলে আসে, তখনই ঘটে দুর্ঘটনা।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে এখানে ১ হাজার ৯১ জন দগ্ধ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শিশু রোগীর সংখ্যা ৪৫৮। গরম পানিসহ উত্তপ্ত তরলে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা ৬৬০। আর নভেম্বরে এই সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৩৮ জনে। এর মধ্যে শিশু রোগী ছিল ৫০৯ জন, উত্তপ্ত তরলে দগ্ধ ৭৫৫ জন।
এমন দুর্ঘটনা এড়াতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসক শাওন বিন রহমান। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের এই আবাসিক সার্জন বলেন, ‘যেহেতু শীতকালে এমন ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যাচ্ছে, তাই গরম কিছু চুলায় রাখার সময় অথবা কোথাও নিয়ে যাওয়ার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’