বিগত সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরকে (ডিজিএফআই) ‘মিসইউজ’ (অপব্যবহার) করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করিম। তিনি বলেছেন, ডিজিএফআইয়ের পলিটিক্যাল ফাংশনটা (রাজনৈতিক কার্যক্রম) থাকা উচিত নয়। এখানে সংস্কার প্রয়োজন।
‘আঞ্চলিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নিরাপত্তাঝুঁকি’ শীর্ষক এক সেমিনারে ডিজিএফআইয়ের কার্যক্রম প্রসঙ্গে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, দেশের অভ্যন্তরের রাজনীতি, সংসদ, বিচার বিভাগসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার জন্য এনএসআই (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) আছে, এসবি (পুলিশের বিশেষ শাখা বা স্পেশাল ব্রাঞ্চ) আছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে ডিজিএফআইকে সরিয়ে নিতে হবে।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে নাগরিক প্লাটফর্ম ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ব্রেইন’। সেমিনারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সেমিনারে জাতীয় নিরাপত্তা প্রসঙ্গে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করিম বলেন, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের খাপছাড়া ভাব দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
নিরাপত্তার ধারণা মানেই শুধু সামরিক বাহিনী নয় উল্লেখ করে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, যখন অন্যান্য উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, তখন সামরিক বাহিনী আসে। তবে সামরিক বাহিনীর এখন অনেক সমস্যা রয়েছে। প্রচুর রাজনীতিকরণ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে জোর দিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করিম বলেন, রাজনীতি ঠিক না করলে সামরিক বাহিনী ঠিক হবে না, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও ঠিক হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ঠিক হবে না। তিনি বলেন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদকে যদি শক্তিশালী করা যায়, তাহলে অনেক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
আমিনুল করিম বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সরকারেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী ধরে রেখেছেন। এটা পুরোপুরি ‘ভুল’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যারা সরকারে আসবে, তারা যেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আলাদা মন্ত্রী দেন, সেই অনুরোধ করেন তিনি।
ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মনোভাব
সেমিনারে ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান ‘পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন’ (তথ্যচিত্র উপস্থাপনা) দেন। এই উপস্থাপনায় ভারতের কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা যাঁরা বর্তমানে বিভিন্ন ‘থিঙ্কট্যাংক’ (নীতি বিশ্লেষণ ও গবেষণা সংস্থা) পরিচালনা করেন, তাঁদের সাম্প্রতিক একটি আলোচনা তুলে ধরা হয়। ওই আলোচনায় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে ডিজ–ইনফরমেশন (অপতথ্য) ছড়ানো, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি, সাইবার হামলা, ‘প্রক্সি’ গোষ্ঠী ব্যবহার করা ইত্যাদি অসামরিক বা আধা সামরিক কৌশল প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, চোপরা, ধুবরি ও কিশানগঞ্জে গত ১৮ মাসে ৩টি ক্যান্টনমেন্ট (সেনানিবাস) করেছে ভারত। ত্রিপুরায়ও একটি ক্যান্টনমেন্ট হতে পারে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও রংপুরের কিছু এলাকাকে তাঁরা (ভারতের সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তারা) ‘চিকেন নেক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ওই সব এলাকায় যদি এমন কোনো কর্মকাণ্ড হয়, যেটা ভারতের জন্য খারাপ, তাহলে বাংলাদেশে ইন্টারভিন (হস্তক্ষেপ) করতে পারবে ভারত, এমন নীতি করার জন্যও সুপারিশ করেছেন তাঁরা।
মাহফুজুর রহমান বলেন, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কেবল রাজনীতিবিদ বা সামরিক বাহিনীর হাতে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়। এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
নিরাপত্তাঝুঁকির যথার্থ বিশ্লেষণ জরুরি
সেমিনারে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলুইৎজ বলেন, বর্তমান পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে বিশাল খরচ করে দামি যুদ্ধজাহাজ না কিনে দেশের ভেতরে কী ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে সেটির যথার্থ বিশ্লেষণ করা জরুরি। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরির বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
‘গণদ্রব্য’
জাতীয় প্রতিরক্ষাকে পাবলিক গুডস (গণদ্রব্য) হিসেবে সেমিনারে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই প্রতিরক্ষা বাজেটের সঙ্গে অন্য বিষয়গুলোর তুলনা করে এটিকে ভিন্ন দিকে নেওয়া হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, নতুন বিশ্বে বিদেশি শত্রুরা অপতথ্য দিয়েও কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। তথ্যযুদ্ধ প্রতিরোধ করার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। দেশের বর্তমান সামরিক বাহিনী অনেক প্রলোভন সত্ত্বেও গত দেড় বছর রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে নাই, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য বিশাল অর্জন বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এটিই হবে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
‘ম্যানেজড’ নির্বাচন
সেমিনারে আলোচক হিসেবে আরও ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশে ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ গড়ে ওঠেনি। প্রধান প্রধান ইস্যুতে কেউ একমত নন। এ কারণেই নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দিলারা চৌধুরী মনে করেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘ম্যানেজড’ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এটা হলে বাংলাদেশ সংকট থেকে বের হতে পারবে না।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মোবাশ্বের হাসান, ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। সেমিনার সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর ও ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক শফিকুর রহমান।