লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩
আবেগপ্রবণ ছিলাম, এখন আর আবেগ দিয়ে নয়, হিসাব দিয়ে কাজ করি: রেনেসাঁ চাকমা
‘আমি রাঙামাটির মনোহরা বেসিক উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। ক্লাস টু থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত সেখানেই পড়েছি। অনেক সংগ্রাম করে বড় হয়েছি, পড়ালেখা করেছি। এভাবেই ২০১৬ সালে এইচএসসি পাস করি।’ পডকাস্টে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কথাগুলো বলেন রেনেসাঁ চাকমা। পর্বটি প্রচারিত হয় গতকাল শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর কীভাবে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন?
রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘আমার বাবা হাইস্কুলের হেড টিচার ছিলেন। ২০০৩ সালে কার অ্যাকসিডেন্টে তিনি মারা যান। তখন আমরা দুই বোন। আমাদের মা কোনো কাজ করতেন না। দাদাবাড়ি থেকেও আমাদের কখনো কোনো সাপোর্ট দেওয়া হয়নি। আমার মা আমাদের দুই বোনকে রাঙামাটিতে আমার মামাদের কাছে নিয়ে আসেন। তখনই আমাদের পড়ালেখা ও জীবন চালানোর সংগ্রামের সময় শুরু হয়।’
পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করার সময়কার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? জানতে চাইলে রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতাম। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর টিউশনি বন্ধ হয়ে গেলে চিন্তায় পড়ে যাই, কীভাবে পড়াশোনা চালাব। তখন আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা সেভিংস ছিল। ভাবলাম, এই টাকাটা কাজে লাগিয়ে যদি কিছু করতে পারি, তাহলে হয়তো সেখান থেকে পড়াশোনার খরচটা বের করতে পারব।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, এত অল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করার চিন্তাটা কীভাবে এল এবং ‘টুকিটাকি’র প্রথম পণ্য কী ছিল?
উত্তরে রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘আমি মেডিক্যালে পড়তে চেয়েছিলাম। ঢাকায় মেডিক্যালে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু সেখানে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া না হওয়ায় একসময় ঢাকা থেকে রাঙামাটিতে চলে আসি। এরপর উদ্ভিদবিজ্ঞানে ভর্তি হই।’
রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘প্রথমে বিষয়টা আমার একদমই পছন্দ ছিল না। কিন্তু করোনা আসার পর ভাবলাম, যেহেতু এটা নিয়েই পড়তে হচ্ছে, এটাকে ভালোবাসতে হবে। এরপর উদ্ভিদবিজ্ঞান ও ভেষজ নিয়ে পড়াশোনা করতে করতে নিম ফেশিয়াল, বিভিন্ন ধরনের ফেসপ্যাক ও মেডিসিনাল প্ল্যান্ট নিয়ে কাজ শুরু করি। এভাবেই টুকিটাকির যাত্রা শুরু।’
টুকিটাকির প্রথম পণ্য তৈরি এবং পাহাড়ে সেই পণ্য নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান সঞ্চালক।
জবাবে রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে এর আগে কখনো কেউ এই ফেশিয়াল ক্লিনজার নিয়ে কাজ করেনি। আমিই প্রথম। যেহেতু আমি উদ্ভিদবিজ্ঞানের স্টুডেন্ট ছিলাম, তাই ফেসবুক দিয়েই তখন আমি ভাইরাল হয়ে যাই।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, টুকিটাকির পাশাপাশি আদিবাসী ও সমতলের নারীদের নিয়ে ‘সাবাংগী’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করছেন। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কী?
রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘সাবাংগীতে আমি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। সাবাংগী মূলত একটা প্ল্যাটফর্ম, যেটার মাধ্যমে সমতল ও আদিবাসী নারীদের আত্ম–উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ করি। আমাদের এখানে দুই শর বেশি উদ্যোক্তা আছেন। তাঁরা নিয়মিত আমাদের সাবাংগী প্ল্যাটফর্মে তাঁদের উদ্যোগের পণ্য প্রচার করতে পারেন।’
পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আরও নারী উদ্যোক্তা তৈরি করতে হলে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন? জানতে চাইলে রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘আমরা যদি আরও ৫০ জন রেনেসাঁ তৈরি করতে চাই, তাহলে তাঁদের বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিংয়ের সুযোগ করে দিতে হবে। তাঁদের যে গ্যাপগুলো আছে, সেগুলো খুঁজে বের করে তাঁদের নিজেদের উন্নয়ন করার মতো স্কিল তৈরি করে দিতে হবে। তাহলেই তাঁরা নিজেদের আরও উন্নত করতে পারবেন।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, পাহাড়ের এমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদের কথা, যেটিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখলে সেখান থেকে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে?
জবাবে রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘নিমগাছ। পাহাড়ে প্রচুর নিম হয়। নিমের যে গুণাবলি, তা বলে শেষ করা যাবে না। একদম শিকড় থেকে গাছের পাতা, এমনকি বাকল পর্যন্ত—সবকিছুরই নানা ব্যবহার আছে। আমরা যদি এগুলোকে একটু নজরে নিয়ে আসি, এখান থেকে আরও অনেক ভালো কিছু সম্ভব।’
এ প্রসঙ্গে রেনেসাঁ চাকমা আরও বলেন, ‘যেমন আমি নিম থেকে নিম ফেশিয়াল তৈরি করছি। তা ছাড়া এখন আমাদের টুথপেস্ট মাইক্রোপ্লাস্টিকে ভরে যাচ্ছে। আমরা যদি নিম কাঠের কয়লা ব্যবহার করে টুথপেস্ট তৈরি করতে পারি, এমনকি শুধু চিবিয়েও ব্যবহার করা যায়—এটা দাঁতের জন্য খুব ভালো।’
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, ব্যবসা শুরু করার সময়কার অভিজ্ঞতা থেকে এখন পেছনে ফিরে তাকালে কোন ভুলটি আর করতে চাইবেন না?
জবাবে রেনেসাঁ চাকমা বলেন, ‘আমি অনেক আবেগপ্রবণ ছিলাম। এখন আমি আর আবেগ দিয়ে নয়, হিসাব দিয়ে কাজ করি।’
নিজের উদ্যোগ ও পথচলার অভিজ্ঞতা থেকে রেনেসাঁ চাকমা জানান, সহজে হাল না ছেড়ে নিজের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েই তিনি এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা টুকিটাকি এখন তাঁর নিজের পাশাপাশি অন্য নারীদেরও উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। তাঁর মতে, প্রশিক্ষণ, পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা পেলে পাহাড়ের নারীদের জন্য আরও অনেক সম্ভাবনার পথ তৈরি হতে পারে।