দেশজুড়ে ভারী বৃষ্টি, ৪ বিভাগে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস

বান্দরবানে টানা ভারী বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বান্দরবান, ৮ জুলাইছবি: মং হাই সিং মারমা

দেশজুড়ে টানা তিন দিন বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল বুধবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামীকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত আট বিভাগেই ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা দিয়েছে।

আষাঢ় শেষের টানা বৃষ্টিতে দেশের চার বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ শহরাঞ্চলগুলোয় জলজট সৃষ্টি হয়েছে।

আর ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির প্রভাবে সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। তবে সম্ভাব্য এ বন্যা তিন দিনের বেশি স্থায়ী হবে না। আগামী শনিবার থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ইতিমধ্যে দেশের দক্ষিণ–পূর্ব ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলের তিন নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, নিম্নচাপ এখন নেই। এর প্রভাব কিছুটা আছে বটে। এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে, তা বর্ষা মৌসুমের স্বাভাবিক বৃষ্টি। আর বায়ুতাপের তারতম্যের কারণে হাওয়া বইছে বেশি। বৃষ্টিও ঝরছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।

রংপুরে ভোর থেকে বৈরী আবহাওয়া। বৃষ্টির পাশাপাশি কখনো চারপাশ কালো মেঘে অন্ধকার হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে মোটরসাইকেলের হেডলাইট জ্বালিয়ে চলছেন এক চালক। উত্তর কেল্লাবন্দ, রংপুর, ৮ জুলাই
ছবি: মঈনুল ইসলাম

দেশের কোথাও কোথাও সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ ২০০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী এবং সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরাসহ উজান এলাকাতেও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। আগামী চার দিন সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘন্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় চট্টগ্রামের আম বাগানে ২৭৭ মিলিমিটার। এছাড়া বান্দরবানে ২১০ মিলিমিটার, কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ২৩০ মিলিমিটার, ময়মনসিংহে ১৭৫ মিলিমিটার, মৌলভীবাজার ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

নানা স্থানে মানুষের দুর্ভোগ

প্রথম আলোর ময়মনসিংহের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল বেলা সাড়ে ১০টার দিকে ময়মনসিংহ নগরের বাঁশবাড়ি কলোনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানি মাড়িয়ে চলাচল করছেন বাসিন্দারা। বস্তির অনেক ঘরে পানি উঠে গেছে। অনেকে সেচে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। বস্তিতে বসবাস করা বাসিন্দারা বলেন, বৃষ্টি হলেই তাঁদের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পানি নেমে যেতে অন্তত এক দিন সময় লেগে যায়। কিন্তু টানা বৃষ্টি হওয়ায় পানি আটকে গেছে। এতে তাঁদের ঘরে রান্না-খাওয়া বন্ধ রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, শ্রীমঙ্গলে বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল সকাল থেকে বিকেল ছয়টা পর্যন্ত একটানা বৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি অনেকেই। জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষকে ভিজেই গন্তব্যে যেতে হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষ।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে গতকাল বিকেল ছয়টা পর্যন্ত ৩৬ ঘণ্টায় ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

শহরের কলেজ রোড এলাকার রিকশাচালক আবদুল কাদির বলেন, সকাল থেকে বৃষ্টির কারণে যাত্রী কম। সারা দিন ভিজে রিকশা চালাতে হচ্ছে। আয়ও অনেক কমে গেছে।

এর মধ্যে গতকাল বেলা তিনটার দিকে পরবতী ৪৮ ঘণ্টার জন্য দেশের সব বিভাগেই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয় আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কার কথাও জানানো হয়।

তিন নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, বন্যার আশঙ্কা

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির কারণে উত্তর-পূর্ব, পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি প্রায় তিন দিন থাকতে পারে। এরপর, অর্থাৎ শনিবার থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানের সাঙ্গু নদ, কক্সবাজারের মাতামুহুরী নদী ও হবিগঞ্জে খোয়াই নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

সরদার উদয় রায়হান বলেন, বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদীর পানিই বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।