যাত্রীবাহী লঞ্চের সংঘর্ষ নয়, ঈদযাত্রা ঘিরে ছড়ানো ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি

পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘিরে প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ কর্মস্থল থেকে বাড়িতে ফেরেন। এই সময় নৌপথও হয়ে ওঠে ব্যস্ত। বিভিন্ন লঞ্চঘাটে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। ঠিক এমন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের সংঘর্ষের একটি ভিডিও।

ভিডিওতে দেখা যায়, নদীর মাঝখানে মুখোমুখি সংঘর্ষে লঞ্চের যাত্রীরা ছিটকে পড়ছেন পানিতে। দৃশ্যটি দেখে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

১৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি ‘Launch Capture’ নামের একটি ফেসবুক পেজে আপলোড করা হয়। সেখানে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘দুটি লঞ্চ যাত্রী নিয়ে সাইড দিয়ে সংঘর্ষ হলো যেভাবে।’ ভিডিওটি প্রকাশের পর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রায় ২২ লাখেরও বেশি মানুষ এটি দেখেছেন।

লিংক: এখানে

শুধু এই ভিডিওই নয়, একই ধরনের আরও কয়েকটি ভিডিও–ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুটি লঞ্চের সংঘর্ষের মুহূর্তে এক নারী যাত্রী আতঙ্কে নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছেন। সেই ভিডিওটিও সাত লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।

লিংক: এখানে

অন্য আরেকটি ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, যাত্রীবোঝাই একটি লঞ্চ ঘূর্ণিস্রোতের মধ্য দিয়ে বিপজ্জনকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৪৩ লাখেরও বেশি বার।

লিংক: এখানে

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, এগুলো কোনো বাস্তব ঘটনার দৃশ্য নয়। ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা।

পর্যবেক্ষণ করে ভিডিওতে লঞ্চের গতিবিধি, যাত্রীদের নড়াচড়া এবং পানির ঢেউয়ের অস্বাভাবিক আচরণসহ বেশ কিছু ভিজ্যুয়াল উপাদান এআই–নির্মিত কনটেন্টের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ঈদ উপলক্ষে এ ধরনের কোনো লঞ্চ দুর্ঘটনার তথ্য দেশের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা সরকারি কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলের তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

যে ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওগুলো ছড়িয়েছে, সেই ‘Launch Capture’ পেজটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পেজটির অনুসারী সংখ্যা প্রায় চার লাখ ৩৮ হাজার। পেজটির ক্যাটাগরিতে উল্লেখ রয়েছে ‘Reels Creator’। অর্থাৎ এটি মূলত ছোট ভিডিও বা রিল তৈরি করে প্রকাশ করার একটি পেজ।

লিংক: এখানে

তাদের বেশি ছড়ানো একটি রিল যার ক্যাপশনে লেখা, ‘লঞ্চ ছাড়ার শেষ মুহূর্তে যাত্রী লঞ্চে উঠল যেভাবে।’ ভিডিওতে দেখা যায় লঞ্চ ছাড়ার আগমুহূর্তে এক যাত্রী ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে উঠছেন সেই খণ্ডিত দৃশ্য ভিউ হয়েছে ৬ কোটি ৭০ লাখ বার।

লিংক: এখানে

পেজটির পুরোনো তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এটি ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর ‘Buchugang’ নামে চালু হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর পেজটির নাম পরিবর্তন করে ‘Launch Capture’ রাখা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে দুজন এই পেজটি পরিচালনা করছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

লিংক: এখানে

পেজটিতে প্রকাশিত ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ রিল নদীপথে চলাচলকারী লঞ্চ এবং লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে তৈরি। কখনো লঞ্চ ছাড়ার মুহূর্ত, কখনো যাত্রীদের ওঠানামা, কখনো ঘাটের ব্যস্ততা—এ ধরনের নানা দৃশ্য তুলে ধরা হয়। আবার কোথাও দেখা যায় ট্রলার দিয়ে মালামাল পরিবহন, কুলিদের দলবদ্ধভাবে লঞ্চে ওঠা কিংবা ঘাটে লঞ্চ ভেড়ানোর দৃশ্য।

লিংক: এখানে, এখানে, এখানে

সদরঘাট ও মুন্সিগঞ্জ টার্মিনালসহ বিভিন্ন ঘাটের পরিবেশ, যাত্রীদের ভিড় কিংবা লঞ্চের ইঞ্জিনরুমে মাস্টার টেলিগ্রাফের মাধ্যমে সংকেত দেওয়ার দৃশ্যও এসব রিলে দেখা যায়। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে পেজটির কনটেন্ট নদীপথে চলাচলকারী লঞ্চ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমকে ঘিরেই তৈরি।

লিংক: এখানে, এখানে, এখানে

তবে একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, এসব কনটেন্টের একটি অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু কোথাও উল্লেখ করা হচ্ছে না যে ভিডিওগুলো এআই–নির্মিত। বরং ক্যাপশনে সেগুলোকে বাস্তব ঘটনার ভিডিও হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যেমন ‘দুই লঞ্চের সংঘর্ষ দেখুন’, ‘ঘূর্ণিস্রোত অতিক্রম করছে লঞ্চ’, ‘যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ডুবে গেল’ বা ‘ফেরি ঘাটে ভেড়ার সময় যা ঘটল’–এ ধরনের দাবি করা হচ্ছে।

লিংক: এখানে, এখানে, এখানে

ফলে অনেক ব্যবহারকারী এসব ভিডিও বাস্তব ঘটনা ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ঈদযাত্রার মতো সংবেদনশীল সময়ে এ ধরনের ভিডিও মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্কও তৈরি করতে পারে। কারণ, ভিডিওগুলোর কোথাও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি যে এগুলো বাস্তব নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।