বদলে যাওয়া জীবনের গল্প: ১৪ বছরে লাখো মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন

পথশিশুদের পড়ানোর একটি ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া মাস্তুল ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য বহুমুখী সেবামূলক কার্যক্রমে রূপ নিয়েছেছবি: মাস্তুল ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে

অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে কাজী রিয়াজ রহমানের হাত ধরে যে মানবিক উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল, তা এখন ১৫ বছরে পদার্পণ করেছে।

পথশিশুদের পড়ানোর একটি ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া মাস্তুল ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্তৃত হয়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য বহুমুখী সেবামূলক কার্যক্রমে রূপ নিয়েছে। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আশ্রয় ও দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

মাস্তুল ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধিত একটি অলাভজনক, অরাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী মানবিক সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমান।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানি অনুমোদনের আওতায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি মানবিক সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই সমাধান তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজের টিউশনির অর্থ থেকে সঞ্চয় করে পথশিশুদের পড়ানোর মাধ্যমে কাজী রিয়াজ রহমান যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, সেটিই পরবর্তী সময়ে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের ভিত্তি তৈরি করে।

কয়েকজন তরুণের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া সেই ছোট উদ্যোগ আজ শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, আশ্রয়, কর্মসংস্থান, দুর্যোগ মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হলো মানুষকে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাবলম্বিতার সুযোগ তৈরি করা।

মাস্তুল ফাউন্ডেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো জাকাত ও সদকার অর্থের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মক্ষম মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা। ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে বিভিন্ন আয়মূলক উপকরণ দিয়ে পরিবারগুলোর জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। একই লক্ষ্য নিয়ে শরিয়াহসম্মতভাবে বেকার ও কর্মক্ষম যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

মাস্তুলের লক্ষ্য-সহায়তা পাওয়া একজন মানুষ যেন ভবিষ্যতে নিজের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন।

খাদ্যসহায়তার ক্ষেত্রে মাস্তুলের রয়েছে নিয়মিত কার্যক্রম। ‘মেহমানখানা’ উদ্যোগের মাধ্যমে রাজধানীর ১৫টি এলাকায় প্রতিদিন অসহায়, পথচারী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রান্না করা খাবার বিনা মূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দৃষ্টিতে খাদ্যসহায়তা শুধু ক্ষুধা নিবারণের বিষয় নয়, সহায়তা গ্রহণকারী মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মাস্তুল ফাউন্ডেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো জাকাত ও সদকার অর্থের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মক্ষম মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা
ছবি: মাস্তুল ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে

শিক্ষা ও আশ্রয়ের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনা করছে মাস্তুল। ঢাকার হাজারীবাগের বারইখালি এলাকায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মাদ্রাসা, এতিমখানা ও শেল্টার হোম। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্যসেবা এবং নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষারব্যবস্থা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি আশ্রয়হীন ও নিঃসঙ্গ প্রবীণদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করতে নির্মাণ করা হচ্ছে ১০ তলাবিশিষ্ট ‘ইসলামিক শেল্টারহোম কমপ্লেক্স’। এতে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, এতিমখানা ও আধুনিক বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করে আসছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন। করোনা মহামারির সময় বেওয়ারিশ ও পরিচয়হীন মরদেহ দাফন থেকে শুরু করে ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের বন্যায় ত্রাণসহায়তা, বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের আওতায় বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল মানবিক কাজ করে যাচ্ছে মাস্তুল। পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজে সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে মরদেহ গোসলখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও মাস্তুল ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। তুরস্কে ভূমিকম্পের পর সহায়তার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের গাজা, সুদান ও নেপালের মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে ২০২৪ সাল থেকে গাজায় যুদ্ধ, অবরোধ ও খাদ্য-চিকিৎসা সংকটে থাকা শিশু, আহত মানুষ ও সাধারণ পরিবারের জন্য পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধসহ মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে মাস্তুল।

যুদ্ধ ও সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা—এই উপলব্ধি থেকে মানুষের সহযোগিতায় গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসাসহায়তা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত ও মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে মাস্তুল।

মাস্তুল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি কাজের মূল উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমরা বিশ্বাস করি, একজন মানুষকে সাময়িকভাবে সাহায্য করার পাশাপাশি তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মানুষ যখন মানবিক সংকটে পড়ে, তখন সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।’

কাজী রিয়াজ রহমান আরও বলেন, ‘মাস্তুলের পথচলায় দেশের মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা চাই, মানুষের জাকাত, সদকা ও দান যথাযথভাবে ব্যবহার করে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে, যেখানে সহায়তা শুধু একটি মুহূর্তের প্রয়োজন মেটাবে না, বরং একজন মানুষের জীবন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করবে।’

১৫ বছরে পদার্পণের এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত ও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ। প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হিসেবে যুক্ত হয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) কাজী ইফতেখার-উল-আলম। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ ও যোগাযোগ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে চিফ পাবলিক রিলেশনস অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান।

অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের মানবিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দাতাদের আস্থা বজায় রাখতে নিয়মিত অডিট ও আর্থিক স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জাকাত ও সদকা কার্যক্রমের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এসব কার্যক্রম শরিয়াহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

মাস্তুলের কাছে মানবিক সেবা শুধু ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব ও শিক্ষার সুযোগ, একটি দরিদ্র পরিবারের আয়, একজন প্রবীণের নিরাপদ আশ্রয়, একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি পরিবারের খাদ্য ও ওষুধ—সব কিছুকেই মানবিক সেবার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটি।

পথশিশুদের পড়ানোর ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের ১৫ বছরে পদার্পণ—প্রতিষ্ঠানটির এই পথচলায় দেশের মানুষের সহযোগিতাই ছিল মূল শক্তি। নতুন এই অধ্যায়ে বাংলাদেশে মানবিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যেতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। সহায়তার মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা রক্ষা, স্বাবলম্বিতা তৈরি এবং প্রয়োজনের সময়ে পাশে থাকার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়েছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন।

মাস্তুল ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম, দাতব্য উদ্যোগ, আর্থিক স্বচ্ছতা ও অডিট রিপোর্টসহ বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে প্রতিষ্ঠানটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে।