বিজয়া দশমীতে আজ শেষ হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব

মহানবমীর পূজার আচার পালন করছেন পুরোহিত। গতকাল রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরেছবি: তানভীর আহাম্মেদ

অঞ্জলি, আরতি ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে আজ বুধবার বিজয়া দশমীতে শেষ হচ্ছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সকালে দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দিনের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর দেবীকে সিঁদুর দিয়ে বরণ, সিঁদুর খেলা ও অন্যান্য আয়োজন শেষে বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ছয় দিনের এ উৎসব। গত শুক্রবার দেবীর পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল শারদীয় দুর্গোৎসব।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, সকাল নয়টায় দশমী বিহিত পূজা শেষে দর্পণ বিসর্জন হবে। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে দেবী দুর্গাকে সিঁদুর দিয়ে বরণ করা হবে। এরপর শুরু হবে সিঁদুর খেলা, যা চলবে বেলা দেড়টা থেকে দুইটা পর্যন্ত। একই সময়ে চলবে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি।

শুভাশীষ কুমার বলেন, দুপুরের পর শুরু হবে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। বেলা তিনটায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা শুরু হবে। এর আগে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আনা হবে। পরে ঢাকার ১১টি ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে। এ বছর ঢাকার ২৫৮টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নবমীতে শান্তি ও মঙ্গল কামনা

অশুভ শক্তির বিনাশ, শান্তি ও মঙ্গল কামনায় মহানবমীর পূজা ও অঞ্জলি দিয়েছেন ভক্তরা। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল থেকে পূজারিদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। মন্ত্রপাঠ, উলুধ্বনি, ঢাক ও কাঁসর ঘণ্টার শব্দে চলে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পূজা শেষে অনেকে মন্দির প্রাঙ্গণের মেলা ঘুরে কেনাকাটা করেন।

সকাল সোয়া ১০টার দিকে মহানবমীর কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা শুরু হয়। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের সঙ্গে ভক্তরা উলুধ্বনি দেন। কেউ দুই হাত জোড় করে প্রণাম করেন, কেউ দেবী দুর্গার জয়ধ্বনি দেন। বেলা ১১টার দিকে ভক্তদের হাতে অঞ্জলির ফুল ও বেলপাতা দেওয়া হয়। সোয়া ১১টার দিকে অঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার এ পর্ব।

স্ত্রী খুমপুই ত্রিপুরা, দুই ছেলে অভিরাজ ও অভিরূপকে নিয়ে পূজা দিতে এসেছিলেন সরকারি কর্মকর্তা অজিত দেব। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন গৃহসহায়ক উরিনা ত্রিপুরা। ধানমন্ডিতে বসবাসকারী অজিত দেব বলেন, ‘পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করতে পেরে ভালো লাগছে। সন্তানদের নিয়ে পূজায় আসা শুধু ধর্মীয় আচার পালনের বিষয় নয়, তাদের কাছে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরারও একটি সুযোগ। মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করি, সবার জীবনে শান্তি, সুস্থতা ও মঙ্গল আসুক। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই যেন মিলেমিশে ভালো থাকতে পারি।’

মন্দির প্রাঙ্গণে পূজার পাশাপাশি বসেছে মেলা। বিভিন্ন স্টলে গৃহস্থালির বাসনকোসন, চুড়ি, গয়না, কাপড়চোপড় ও শিশুদের খেলনা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পূজা দিতে আসা অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলা ঘুরে দেখছেন, কিনছেন পছন্দের জিনিস।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উপদেষ্টা অরূপরতন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মহালয়া থেকে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী হয়ে মহানবমী পর্যন্ত দুর্গোৎসবের প্রতিটি পর্ব এবার ভালোভাবে উদ্‌যাপন করা গেছে। এ জন্য তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

অরূপরতন চৌধুরী বলেন, মা দুর্গা দুর্গতি নাশ ও অসুর বিনাশের প্রতীক। দেবীর কাছে তাঁরা মানুষের অশুভ প্রবৃত্তি ও অশান্তি দূর হওয়ার প্রার্থনা করেন। দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটুক এবং সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করুক—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা। অন্যায়-অবিচার থেকে দূরে থেকে সবাই যেন সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারেন, মহানবমীতে দেবীর কাছে সেই মঙ্গলও কামনা করেন ভক্তরা।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত ধর্মদাস চক্রবর্তী বলেন, ‘মা আমাদের সবার অভিপ্রায় স্বর্গে নিয়ে গেছেন। আমাদের ইচ্ছাগুলো সব দেবতার কাছে ভাগ করে দেবেন। যার যা প্রয়োজন, তাকে তা–ই দেবেন। তবে এত এত আনন্দের মধ্যেও মাকে বিদায় দিতে হবে। এ বিদায়-বিসর্জন দুঃখের।’