পদায়ন–পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে প্রশাসনে গতি আসছে না: গোলটেবিলে বক্তারা
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের আমলাতন্ত্রের নানা সমস্যা ও বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে এক গোলটেবিল বৈঠকে। সেখানে বক্তারা বলেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশের আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। আর এখন নতুন সরকার আসার পর পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে প্রশাসনে তেমন গতিশীলতা আসছে না।
আমলাতন্ত্রে রাজনৈতিক পাটাতন ভাঙার পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বক্তারা। নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে গোয়েন্দা প্রতিবেদন বাদ দিলে আমলাতন্ত্রের প্রায় সিংহভাগ রাজনীতিকরণ ঠেকানো যাবে বলে মনে করেন তাঁরা।
সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজিত ‘রাষ্ট্র গঠন ও আমলাতন্ত্র: দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা উঠে আসে। আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন সাবেক আমলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বক্তব্য দেন।
গোলটেবিল বৈঠকে গভর্ন্যান্স গবেষক ইউসূফ জারিফের লেখা লিখিত মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম। এ ছাড়া পুরো লিখিত বক্তব্যটি অনুষ্ঠানের উপস্থিত ব্যক্তিদের দেওয়া হয়।
লিখিত বক্তব্যে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা ও পটভূমি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বিগত ৫০ বছরে বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নষ্ট করা হয়েছে। দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমলাতন্ত্র সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র আমলাতন্ত্র ছাড়া চলতে পারে না। কিন্তু একটি দুর্বল ও অপেশাদার আমলাতন্ত্র বাস্তবে একটি দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার জন্য রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রকে দায় নিতে হবে।
অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিবেচনায় আমলাতন্ত্র পেশাদার না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক অগ্রগতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্র গঠন এজেন্ডা বহুলাংশে ব্যাহত হয়।’ লিখিত বক্তব্যে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের প্রসঙ্গও উঠে আসে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার দিয়ে ক্ষমতায় এলেও কাঠামোগত পরিবর্তনে তেমন সফল হয়নি। জনপ্রশাসন নিয়ে একটি কমিশন গঠন করা হলেও তার কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। নতুন সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস হলেও আমলাতন্ত্রসহ সব পেশাজীবীকে কুক্ষিগত করা অনুসরণ করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক মেধাবী কর্মকর্তাকে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় ও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করেছে। এ পর্যন্ত উচ্চতর পদে, বিশেষ করে সচিব ও সংস্থাপ্রধান পদে যেসব নিয়োগ হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরিই রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত।
অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আমলাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল বলে প্রতীয়মান হয় না। দেশে বেকারত্ব, বিনিয়োগ মন্দা, গুণগত শিক্ষার অভাব, সুশাসনের ঘাটতি ইত্যাদি নানামাত্রিক সংকট বিদ্যমান। এসব সংকট থেকে উত্তরণে একটি কার্যকর ও পেশাদার আমলাতন্ত্র জরুরি। কিন্তু নতুন সরকার আসার পর দেখা যাচ্ছে প্রশাসনে তেমন গতিশীলতা আসেনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনা।
আমলাতন্ত্রকে পেশাদার করতে বিভিন্ন সুপারিশ করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন গ্রহণ বাদ দিতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে সাবেক সচিব আলেয়া আক্তার বলেন, পরিকল্পিতভাবে আমলাতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনতে দেওয়া হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক শাহজাহান খান মনে করেন, সংস্কার নয়, আমলাতন্ত্রের পুনর্নির্মাণ দরকার।
সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির সভাপতি ও সাবেক আমলা মোহাম্মদ শরিফুল আলমের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাবেক আমলা মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম, খ ম কবিরুল ইসলাম, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম প্রমুখ।