২১ বছর বয়সী এতিম তরুণী নূপুর চৌধুরী। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়াই মানবিক দায়বদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে তিনি জুলাই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে আহত হন। আজীবন শরীরে বুলেট বয়ে বেড়ানোর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।
হিজড়া প্রিয়া খানসহ তাঁর সঙ্গীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজে আহত ব্যক্তিদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করেছেন। পরিবহনশ্রমিক মাসুম মিয়া আন্দোলনে অংশ নিয়ে চারবার গুলিবিদ্ধ হন এবং মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন।
এমন মানুষদের কথা তুলে ধরা হয়েছে দ্য জুলাই রিজলভ বইটিতে। বইটিতে মূলত ছাত্র, শিক্ষক এবং সাধারণ শ্রমজীবীদের বয়ানে সেই ৩৬ দিনের বিক্ষোভ, সহিংসতা এবং চূড়ান্ত বিজয়ের স্মৃতিচারণা করা হয়েছে। এতে শহীদ তরুণ আবু সাঈদ, কিশোর শাহরিয়ার খান আনাসদেরও বীরত্বগাথা তুলে ধরা হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর গুলশানে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পার্কের দ্য বুকওয়ার্মে বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন অনুষ্ঠানের প্যানেল আলোচকেরা। আলোচকেরা বলেছেন, বইটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে জুলাইয়ের ঐতিহাসিক আন্দোলনের চেতনা তুলে ধরার পাশাপাশি স্মৃতি সংরক্ষণের একটি প্রচেষ্টা। শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিবরণ তুলে ধরা হয়নি, স্বৈরাচারী শাসনের পতনে সাধারণ মানুষের সংকল্প এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক গভীর সংকলন।
বইটি সংকলন ও প্রকাশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন ‘ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’–এর সদস্যরা। ফাউন্ডেশনের সদস্যরা রাজধানীর দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাই আন্দোলনকারীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেন। বইটি সম্পাদনা করেছেন এই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রেজওয়ান রহমান। গণ-অভ্যুত্থানটি মোট ৩৬ দিন স্থায়ী হয়েছিল। এই ৩৬ দিনের প্রতিটি দিনের স্মরণে বইটিতে ৩৬টি বিশেষ গল্প সংকলিত করা হয়েছে। আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিলেও রিকশাচালক, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, ফটোসাংবাদিক, পোশাকশ্রমিক, মুদিদোকানি, নার্সদের মতো সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন—সেই বয়ানই গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। আন্দোলনে গিয়ে যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের ভোগান্তির কথাও গুরুত্ব পেয়েছে। বইটির জন্য ৫০ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, যাঁরা সরাসরি আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড বইটির ডিস্ট্রিবিউটর।
বইটি নিয়ে আলোচনায় রেজওয়ান রহমান বলেন, ‘দুটি হাসপাতালে আমরা গুরুতর আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা চাইছিলেন তাঁদের গল্পগুলো বলতে। কেন আপনারা জীবন বিপন্ন করে এমন ঝুঁকি নিলেন, জানতে চাইলে উত্তর দিয়েছিলেন, তাঁরা স্বাধীনতার জন্য এটা করেছেন। এ আত্মত্যাগ সার্থক ছিল কি না, এর উত্তরেও তাঁরা হ্যাঁ বলেছেন।’
জুলাই শুধু একটি আন্দোলন নয়, জুলাই একটি চেতনা—এমন মন্তব্য করে রেজওয়ান রহমান বলেন, সবাই ভেবেছিলেন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করা গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি হতাশাজনক। এরপরও বর্তমানটা যতই তিক্ত হোক না কেন, যে অর্জন, তা যাতে আর কেউ কেড়ে নিতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বইটি সে কথাই সবাইকে মনে করিয়ে দেবে।
আলোচনায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, বইটি ইতিহাস স্মরণ করার এবং ঘটনাগুলো মনে রাখার একই প্রক্রিয়ার অংশ।
প্যানেল আলোচনায় অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, কাউন্টার পয়েন্টের সম্পাদক জাফর সোবহান, আইনজীবী মানজুর আল মতিন অংশ নেন।
ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো সোহেলা নাজনীনের সঞ্চালনায় আলোচকেরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের বিভিন্ন স্মৃতিচারণা করেন। একই সঙ্গে এই আন্দোলন সামনে রেখে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁরা জুলাই আন্দোলনের গল্পগুলোকে বারবার সামনে তুলে ধরার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। তাঁরা বলেন, বিজয় তখনই আসবে, যখন মানুষকে মাঝরাতে গুম করা হবে না, যেখানে মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হবে না, যেখানে মানুষকে গোপন কারাগারে রাখা হবে না, যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তরুণেরা রাস্তায় মারা যাবে না এবং শাসকেরা আর নিপীড়ন বা দমন করবে না।