শুরু হলো মাহে রমজান। সংযম ও ইবাদতের এই মাসে সবার দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় আসে পরিবর্তন। বিশেষ করে অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টজনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগে যাঁরা ভুগছেন, রোজা রেখে ইনহেলার ব্যবহার এবং ওষুধের ডোজ সমন্বয় নিয়ে তাঁদের মনে নানা সংশয় ও প্রশ্ন থাকে। সঠিক সময়ে ওষুধের সমন্বয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার ব্যবহার করলে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই সুস্থভাবে রোজা রাখা সম্ভব।
‘রমজান মাসে ইনহেলার ও ওষুধ গ্রহণের সঠিক নিয়ম’ শীর্ষক বিশেষ অনলাইন আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথাই বললেন দেশের সুপরিচিত বক্ষব্যাধিবিশেষজ্ঞ এবং ইনজিনিয়াস হেলথকেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. রাশিদুল হাসান। এসকেএফ রেসপিকেয়ার এই আলোচনার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটির সায়েন্টিফিক পার্টনার ছিল এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং ব্র্যান্ড পার্টনার ছিল ট্রায়োসন এমডিআই ও ট্রায়োনিড এমডিআই।
অনুষ্ঠানটি গতকাল বুধবার সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো ডটকম এবং প্রথম আলো ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন তাসনুভা মোহনা।
আলোচনার শুরুতে অধ্যাপক ডা. মো. রাশিদুল হাসান জানান, শ্বাসকষ্টের সমস্যা মূলত আবহাওয়া পরিবর্তন বা ভাইরাল ইনফেকশনের মতো পরিবেশগত কারণে বাড়ে বা কমে, যা সরাসরি রোজার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তবে যাঁরা রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখেন না বা যাঁদের হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তাঁদের জন্য সঠিক চিকিৎসা জানা জরুরি। তিনি জানান, ইনহেলারের ওষুধের কণাগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং তা বাতাসের সঙ্গে শ্বাসের মাধ্যমে সরাসরি ফুসফুসে যায়। বিশেষ করে সাহ্রি ও ইফতারের সময় ইনহেলার ব্যবহার করলে সারা দিন সুস্থ থাকা সম্ভব।
রমজানে ওষুধের স্বাভাবিক রুটিন সমন্বয় নিয়ে ডা. মো. রাশিদুল হাসান বলেন, যেহেতু এ মাসে প্রাত্যহিক খাওয়ার সময় বদলে যায়, তাই ওষুধের সময়ও পরিবর্তন করতে হয়। সাধারণত সকালে খাওয়ার ওষুধগুলো ইফতারের পর এবং রাতের ওষুধগুলো সাহ্রির সময় গ্রহণ করা যেতে পারে। যাঁরা ইনসুলিন নেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ভোরের ডোজ রাতে এবং রাতের ডোজ ভোরে সমন্বয় করা উত্তম। যাতে দিনের বেলা সুগার কমে গিয়ে ‘হাইপো’ হওয়ার ঝুঁকি না থাকে। অনেক সময় ডাক্তারেরা দিনে তিনবার ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন। সে ক্ষেত্রে ইফতার, রাতের খাবার ও সাহ্রির সময় মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টাকে ভাগ করে ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। তবে বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা এমন ওষুধ দেওয়ার চেষ্টা করেন, যেগুলো দিনে দুবার সেবন করলেই চলে, যা রোজাদারদের জন্য অনেক সুবিধাজনক।
রোজা রাখা অবস্থায় ইনহেলার বা নেবুলাইজারের ব্যবহার নিয়ে অনেকের মনে নানা রকম প্রশ্ন থাকে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. মো. রাশিদুল হাসান ‘স্পেসার’ ব্যবহার করে ইনহেলার নেওয়ার পরামর্শ দেন। যদি কেউ ১০ পাফ সালবিউটামল ইনহেলার স্পেসারের মাধ্যমে নেয়, তবে তা নেবুলাইজারের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
অ্যাজমা রোগীদের জন্য কিছু বিশেষ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ডা. মো. রাশিদুল হাসান বলেন, যাঁদের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর এবং দিনে চার-পাঁচবার ইনহেলার লাগে, তাঁদের জন্য রোজা রাখা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ছাড়া সাহ্রি খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। কারণ, ভরা পেটে শুয়ে পড়লে খাবারের অংশ শ্বাসনালিতে চলে আসার আশঙ্কা থাকে, যা থেকে তীব্র কাশি বা শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে তিনি অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, মিষ্টি বা ডালজাতীয় খাবার যা গ্যাস্ট্রিক ও অ্যালার্জি বাড়ায়, সেগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কোনো খাবারে যদি কারও সমস্যা থাকে, তবে তা বর্জন করা আবশ্যক।
সবশেষে দর্শকদের উদ্দেশে ডা. মো. রাশিদুল হাসান পরামর্শ দেন যেন রমজান মাসে রোগীরা ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখেন এবং পোষা প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেন। তিনি বলেন, রমজানেও হালকা ব্যায়াম করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠান ‘ইনজিনিয়াস হেলথকেয়ার লিমিটেড’ থেকে রোগীদের সহায়তার জন্য এক্সারসাইজ প্রোগ্রাম ও ই-বুক সরবরাহ করা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষে ডা. মো. রাশিদুল হাসান আশ্বস্ত করেন, সঠিক নিয়ম মেনে এবং সময়মতো ওষুধের ডোজ পরিবর্তন করে নিলে শ্বাসকষ্টের রোগীরাও অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে পুরো মাস রোজা পালন করতে পারবেন।