স্কুল–কলেজে এক দিন অনলাইন, পরদিন সশরীর ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনা

ক্লাসে শিক্ষার্থীরাফাইল ছবি

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের পরিপ্রেক্ষিতে মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিশ্ববিদ্যালয় বাদে) অনলাইন ও সশরীর মিলিয়ে (ব্লেন্ডেড) ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস রেখে এর মধ্যে জোড়–বিজোড় মিলিয়ে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীর পাঠদানের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

অর্থাৎ শনিবার যদি অনলাইন ক্লাস হয়, তাহলে রোববার হবে সশরীর ক্লাস। এভাবে এক দিন অনলাইন ক্লাস হলে তার পরদিন সশরীর ক্লাসের পরিকল্পনা করে সপ্তাহের ক্লাস সাজানোর কথা ভাবা হচ্ছে।

এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা। এখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে বা মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভার সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এর আগে আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সশরীর ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানান। এ বিষয়ে আগামী বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা।

পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে এক মতবিনিময় সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় আপাতত সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেওয়ার প্রস্তাব ওঠে, যার মধ্যে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীর ক্লাস থাকবে। শিক্ষকেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ক্লাস নেবেন এবং জোড়-বিজোড় দিন ধরে অনলাইন ও সশরীর ক্লাসের সময়সূচি নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে ব্যবহারিক (প্র্যাকটিক্যাল) ক্লাস সশরীরই নেওয়া হবে। সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী এ সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলোচনা। এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে বা মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হলে তা চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে।

যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী

মতবিনিময় সভার আগে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোকে উৎসাহিত করার ব্যাপারে আলোচনা করছেন। যেহেতু বিশ্বব্যাপী সংকট (জ্বালানিসংকট), তার মানে বাংলাদেশেও। তাঁরা কেউ জানেন না, কত দিন এ সংকট চলবে। সে কারণে তাঁরা ভাবছেন, দেশের স্কুলব্যবস্থাকে অনলাইন ও সশরীর—এই মিশ্র পদ্ধতিতে আনা যায়। পবিত্র রমজান উপলক্ষে ছুটি এবং বিভিন্ন আন্দোলন মিলিয়ে নির্ধারিত কিছু ক্লাস হয়নি। এ জন্য এখন স্কুলকে সপ্তাহে ছয় দিন করা হয়েছে (পরবর্তী ১০টি শনিবার)। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানিসংকটের কারণে তাঁরা ভাবছেন, অনলাইন ও সশরীর—এই মিশ্র পদ্ধতি করা যায় কি না।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে তাঁরা জরিপ করে দেখেছেন যে ৫৫ শতাংশ অংশীজন চাচ্ছেন অনলাইনে যেতে। কিন্তু পুরোপুরি অনলাইন হয়ে গেলে অসামাজিক হয়ে যাবে কি না, সেটাও ভাবছেন। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব দেবেন এবং সেখানে আলোচনা হবে। তারপর এর সিদ্ধান্ত আসবে।

সপ্তাহের ছয় দিনের মধ্যে কয় দিন সশরীর এবং কয় দিন অনলাইন ক্লাস হবে, সে বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাব সুনির্দিষ্ট করেননি শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, তাঁরা মিশ্র পদ্ধতি করতে চাচ্ছেন। তাঁরা মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব দেবেন, কিন্তু মন্ত্রিসভা যেটা গ্রহণ করবে, সেটাই হবে। এখনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি বলে জানান মন্ত্রী।

বিশ্ববিদ্যালয় বাদে সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। বিশেষ করে তাঁরা মহানগরীর কথা বলছেন।

পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতরসহ বিভিন্ন উপলক্ষে প্রায় ৪০ দিনের ছুটির পর গত রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকটে পড়েছে অনেক দেশ, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন পাঠদান চালুর বিষয়টি সামনে এসেছে।

এর আগে করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর বিকল্প হিসেবে অনলাইন ও টেলিভিশনে ক্লাস চালু করা হলেও বিভিন্ন গবেষণায় সেগুলোর কার্যকারিতা সীমিত বলে উঠে আসে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শ্রেণিকক্ষের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নেই, তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো সশরীর ক্লাসের কার্যকর বিকল্প গড়ে ওঠেনি। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকটের বাস্তবতায় বিকল্প পদ্ধতির দিকে যেতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অনলাইন ও সশরীর মিলিয়ে একটি সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। কিন্তু এমন ব্যবস্থায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তাই তাদের জন্য এলাকাভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থা বা বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়টি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ শুরুর আগেই একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবার জন্য একটি সাধারণ নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে।