তিন বছরে চার শতাধিক গার্মেন্টস বন্ধ হয়েছে: সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী
গত তিন বছরে চার শতাধিক গার্মেন্টস (তৈরি পোশাক) কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মোক্তাদির। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রুহুল আমিনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ‘২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৩ বছরে বিজিএমইএর সদস্য ২৮২টি এবং বিকেএমইএর ১২০টিসহ প্রায় ৪ শর বেশি গামের্ন্টস কারখানা বন্ধ হয়েছে। বন্ধ কারখানার নামের তালিকা সংগ্রহের কর্যক্রম চলমান আছে।’
গত ২২ জুন বিজিএমইএ থকে পাওয়া প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী এ তথ্য জানান। এ সময় তিনি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হওয়ার আটটি কারণ উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো করোনা পরিস্থিতি; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ; মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ, আমেরিকা-ইরানের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ; আন্তর্জাতিক মন্দা পরিস্থিতি; দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা; অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্যসংকট; ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের এফটিএ চুক্তি এবং বিদেশি ক্রেতার নিজস্ব মনিটরিংয়ের সুবিধার্থে ছোট ও মাঝারি কারখানায় রপ্তানি আদেশ প্রদানে অনাগ্রহ।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বাজার ধরে রাখার জন্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ শীঘ্রই স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ফলে উন্নত রাষ্ট্র কর্তৃক টেড্রিং স্কিমের আওতায় অগ্রাধিকার বাজার–সুবিধা হারাবে এবং এর প্রভাবে ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইতিমধ্যে জাপানের সঙ্গে ইপিএ (অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি) চুক্তি হয়েছে। কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ (সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি) সম্পাদনের বিষয়টি চলামান আছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি, আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, চায়নাসহ অন্যান্য রপ্তানি–সম্ভাবনাময় দেশের সঙ্গে ইপিএ/সিইপিএ/মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মোক্তাদির বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পোশাকশিল্পের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হলো ৪৪ হাজার ৫০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি বছরের জুলাই মাসে অর্জিত হয়েছে ৩ হাজার ৮৮৬ দশমিক ৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য–ঘাটতি আরও বেড়েছে
বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য–ঘাটতির তথ্য তুলে ধরেন। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাণিজ্য–ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ৩১৩ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১ হাজার ৬৯৮ দশমিক ৬০ মিলিয়ন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭১৬ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪৩০ দশমিক ৯৬ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য–ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ৮৫৯ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আবদুল বাতেনের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, আগের বছরের তুলনায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য–ঘাটতি আরও বেশি বেড়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ এখন প্রায় পৌনে ১৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বাকি অংশ ভারত থেকে বাংলাদেশে আসে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারতের দিক থেকে কিছু বাধা থাকার পাশাপাশি গত দুই বছরে বাংলাদেশের দিক থেকেও কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
ভারত থেকে আমদানি বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমদানি সরকার করে না, মূলত ব্যবসায়ীরা করেন। ব্যবসায়ীরা যে উৎস থেকে প্রতিযোগিতামূলক কম দামে পণ্য পান, সেখান থেকেই আমদানি করেন। মন্ত্রী বলেন, উৎস হিসেবে যদিও একটি দেশের ক্ষেত্রেই ব্যবধানটা এত বেশি, কিন্তু যাঁরা আমদানি করেন তাঁরা তাঁদের সুবিধা বিবেচনায় নিয়েই সেখান থেকে আমদানি করেন।
সম্প্রতি ভারতের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের কথা তুলে ধরে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ওই প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার এ প্রস্তাবে আগ্রহ দেখিয়েছে। এভাবে রপ্তানি বাড়াতে সমন্বিতভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, চীনের সঙ্গেও বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য–ঘাটতি রয়েছে। তবে সরকার কোনো একটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য–ঘাটতি আলাদাভাবে না দেখে সামগ্রিক বাণিজ্য পরিস্থিতির দিকে নজর দিতে চায়।
সার্বিকভাবে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো দরকার উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রপ্তানি বাড়াতে সরকার চামড়া, পাট, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল, সেমিকন্ডাক্টরসহ কয়েকটি খাত চিহ্নিত করেছে। এসব খাতের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে নীতিসহায়তা দেওয়া এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান মোল্যার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি চুক্তি করার ফলে বাংলাদেশ তার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় দেশটির বাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনবিশিষ্ট থ্রি–হুইলার যানবাহন (টেম্পো, অটোরিকশা ইত্যাদি) (এইচএস হেডিং ৮৭.০৩ এর সংশ্লিষ্ট সব এইচএস কোড) আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯ অনুযায়ী আমদানিনিষিদ্ধ। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২৬ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার উৎপাদনশিল্পকে সহায়তার জন্য যন্ত্রাংশ আমদানি করা হচ্ছে।