কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তিতুমীর

বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। আজ সোমবার রাজধানীর রমনায় বিআইআইএসএস মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো।

কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থার ফলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জ্বালানিসংকটের কারণে জনগণ যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, তার জন্য সরকার সমব্যথী বলে জানান। উপদেষ্টা বলেন, জনগণের প্রতি সরকারের সহানুভূতি রয়েছে। তবে বাস্তবতা আড়াল করে কোনো ‘মিরাকল ন্যারেটিভ’ তৈরি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হবে না।

আজ সোমবার রাজধানীর রমনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন উপদেষ্টা।

‘বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে স্থিতিস্থাপক জ্বালানি রূপান্তরের পথে’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ।

জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা বা অর্থনীতির বিষয় নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এটি সরকারের সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। দেশের জ্বালানি খাতকে কীভাবে দেখা হবে, তার ওপরও জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ভর করে।

দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফটি) উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে সরবরাহ আছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফটি, যার মধ্যে ১ হাজার ৬০০ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে; আর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে ১ হাজার পাওয়া যাচ্ছে।

আবেদনকৃত গ্রাহকসহ দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা ৫ হাজার ২০০ এমএমসিএফটি হওয়ার কথা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, এই চাহিদা মেটানোর জন্য সরকার ইতিমধ্যে নানা রকমের উদ্যোগ নিয়েছে। মাতারবাড়ীতে ১ হাজার এমএমসিএফপি ক্ষমতার স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল এবং মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে ৬০০ এমএমসিএফটি ক্ষমতার ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের লক্ষ্যে চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৭ সালের শুরুর দিকে উৎপাদনে আসতে পারে বলেও জানিয়েছেন উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তবে কেন্দ্রটি চালুর আগে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।

গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে ১৭ দিনের ডিজেল মজুত থাকলেও এখন তা বেড়ে ৩২ দিনের হয়েছে বলেও জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে ৯০ দিনের মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সরকার।

আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির সঙ্গে সোলার প্যানেল স্থাপনের পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, এতে কৃষিজমির ওপর চাপ না বাড়িয়ে এবং পানির বাষ্পীভবন কমিয়ে প্রতি কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে।

আমদানি বেড়েছে ৪২.৫%

সেমিনারে তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মঞ্জুর আলম প্রধান এবং এসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইজাজ হোসেন। তাঁরা বর্তমান জ্বালানি নিরাপত্তা পরিস্থিতির সার্বিক দিক তুলে ধরেন।

এসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ২০০০ সালের দিকে দেশে জ্বালানি উৎপাদন ও আমদানির মধ্যে ভারসাম্য থাকলেও পরে আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে আমদানির নির্ভরতা মাত্র ২০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তেলের দাম কম থাকাকালীন অপরিশোধিত তেল কিনে রেখে সংকটকালে ব্যবহারের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি সংকট কাটানোর পরামর্শ দেন তিনি। বলেন, ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি এড়াতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশে জ্বালানির সঠিক কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির বলেন, আগস্টে দেশে গ্যাসের গড় সরবরাহ চাহিদার মাত্র ৫৫ শতাংশে নেমে আসে। এতে নরসিংদী, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা খেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। ব্যাংক খাতেও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এতে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এর প্রভাবে প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মঞ্জুর আলম প্রধান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে তেলের মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন তেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে ৫৫ দিনের মতো চাহিদা মেটানো সম্ভব। তিনি বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

পরে উন্মুক্ত আলোচনা হয়। আলোচনায় অংশ নেন জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ, সাবেক কূটনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক ও বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান। তিনি একমুখী জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও উৎস তৈরি এবং সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন।