১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিআইএ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা আনতে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় তারা। অবশ্য কখনো কখনো এই প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও পরিদর্শনের সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক অলিউল্লাহ মো. আজমতগীর প্রথম আলোকে বলেন, ডিআইএ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর পরবর্তী কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেয় মন্ত্রণালয়। তবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমিগুলো বেহাত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

বেহাত হলো যত জমি
ডিআইএ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলোর একটি সারাংশ করেছে। তাতে দেখা যায়, বিদ্যালয় ও কলেজে ২২৬ দশমিক ৯২৮৪৮ একর জমি বেহাত হয়েছে। আর কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাত হওয়া জমির পরিমাণ ৮৯ দশমিক ৭৭০২ একর।

এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে বেহাত হওয়া জমির পরিমাণ বেশি দেখা গেছে। ওই মাসের প্রতিবেদনগুলোতে প্রায় ৮২ শতাংশ জমি বেহাত হওয়ার কথা জানিয়েছে ডিআইএ। গত বছরের অক্টোবর মাসে জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলোতে ৬৫ একরের বেশি জমি বেহাত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর সবচেয়ে কম জমি বেহাত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে গত বছরের জুলাই মাসের প্রতিবেদনগুলোতে।

ডিআইএর তথ্যমতে, আগের চেয়ে জমি কমে যাওয়া একটি প্রতিষ্ঠান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার কে কে টি হাজী এন সি ইনস্টিটিউট। ৭৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান ২৭ বছর আগেও একবার পরিদর্শন করেছিল ডিআইএ। তখন বিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩৯ একর। প্রতিষ্ঠানটি আবারও পরিদর্শন করেছে ডিআইএ। গত ২১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা হয় বিদ্যালয়টির জমির পরিমাণ ৩ দশমিক ৪০ একর। ২৭ বছরে কমেছে প্রায় এক একর জমি।

প্রতিবেদনের এসব তথ্য পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিতে সশরীর গিয়েছিলেন প্রথম আলোর গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি। তিনি দেখেছেন, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে দুটি বহুতল ভবনসহ চারটি ভবন রয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক কুমার পাল ও দাতা সদস্যরা জানিয়েছেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নিজস্ব জমি না থাকায় ১৯৯২ সালে কাঠি গ্রামের আবদুল হাই ওই বিদ্যালয়ের নামে ৩২ শতক জমি লিখে দেন। এ ছাড়া তেলীগাতি গ্রামের আতাহার শেখ ও কাঠী গ্রামের আবদুস সালাম মৌখিকভাবে বিদ্যালয়ে দুই বিঘা জমি দান করে দাতা সদস্যপদ লাভ করে। কিন্তু ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি যাচাই–বাছাই করে দেখেন, কোনো জমি দেওয়া হয়নি। এ জন্য ওই বছর ওই দুজনকে দাতা সদস্যর পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়।

বিদ্যালয়ের তৎকালীন (১৯৯৫) সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান নাসির সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই সময় আমরা জানতে পারলাম, বিদ্যালয়ের নামে কোনো সম্পত্তি নেই। ওই অবস্থায় বিদ্যালয় টিকবে না। তাই ১৯৯৬ সালে আমি ও আমার স্ত্রী সেলিনা নাসির ৬৬ শতক, আমার ভাই নুর উদ্দিন সরদার ৪৫ শতক জমি বিদ্যালয়ের নামে লিখে দিই। এ ছাড়া ওই বছর বিদ্যালয়ের টাকা দিয়ে ১ দশমিক ১৮ একর জমি বিদ্যালয়ের নামে কিনি। সর্বশেষ একই গ্রামের নাজমুল হক ও তাঁর ভাই মাহাবুব হক ২০০৩ সালে ১৫ শতক জমি বিদ্যালয়ের নামে দেন। ওই সব জমি বিদ্যালয় থেকে অনেক দূরে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত। কিন্তু ভুলক্রমে ১৯৮৪ সালে কীভাবে যেন বিদ্যালয়ের নামে ৪ দশমিক ০৭ একর এবং ১৯৯৫ সালে ৪ দশমিক ৩৯ একর দেখানো হয়।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক কুমার পাল প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ২০০৯ সালে এই বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে বিদ্যালয়ের যেসব সম্পত্তি, তার খাজনা পরিশোধ করছেন নিয়মিত। তবে ইতিপূর্বে বিদ্যালয়ে দুটি নিরীক্ষা হয়েছে, সেখানে কীভাবে ৪ দশমিক ০৭ এবং ৪ দশমিক ৩৯ একর জমি বিদ্যালয়ের নামে লেো হলো, তা তাঁর জানা নেই।

ডিআইএর প্রতিবেদনে জমি কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার পাথারিয়া গাংকুল মনসুরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৪ সালে যখন পরিদর্শন করা হয়েছিল, তখন ওই প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষই জানিয়েছিল, জমি ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। কিন্তু গত জানুয়ারিতে জমা দেওয়া নতুন পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এখন জমি ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ। আগের তুলনায় ৭ দশমিক ৮৪ একর জমি কমেছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল করা সব জমি দখলে এনে বিধি অনুযায়ী তার রেকর্ড শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

তবে প্রথম আলোর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে দেখেন জমিদাতাদের নাম, দাগ, মৌজা ও জায়গার পরিমাণ বোর্ডে উল্লেখ করা আছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ এফ এইচ এম ইউসুফ আলী জানিয়েছেন, তিনি ২০১৪ সাল থেকে দায়িত্ব আছেন। ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ জমির বাইরে জমি ছিল, এ রকম তিনি শোনেননি। পরিচালনা কমিটির সদস্য আবদুর রব জানান, যাঁরা জায়গা দান করেছেন, তাঁদের নাম প্রকাশ্যে দেওয়া আছে। কারও নাম বাদ পড়লে অবশ্যই প্রতিবাদ করতেন।
সরেজমিনের এসব তথ্য ডিআইএ কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা পুরোনো ফাইল বের করে যাচাই করে এই প্রতিবেদককে বলেন, ১৯৯৪ সালে ১৩ দশমিক ৫৫ একর জমি থাকার তথ্য দিয়েছিলেন তৎকালীন অধ্যক্ষই। তাতে ওই সময় মাদ্রাসার ঘর, সামনের মাঠ (বাগান), ধান চাষ করা জমি, কিছু পতিত জমির কথা উল্লেখ আছে।

ডিআইএর এই তথ্যের পর কথা হয় বর্তমান অধ্যক্ষ এফ এইচ এম ইউসুফ আলীর সঙ্গে। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তৎকালীন ওই অধ্যক্ষ মারা গেছেন। হয়তো ভুল করে ওই সময় বেশি জমি উল্লেখ করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি দাবি করেন, কোনো জমি বেহাত হয়নি।

অপচয়-অনিয়ম
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ডিআইএর প্রতিবেদনগুলোতে নানা রকম অনিয়ম ও অপচয়ের চিত্রও ফুটে উঠেছে। অনিয়ম বা অপচয়ের মাধ্যমে ক্ষতি করা ৪৮ কোটি ৩৩ লাখের বেশি টাকা আদায় করার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
শুধু এবারই নয়, বিভিন্ন সময় ডিআইএ এ ধরনের সুপারিশ করে থাকে। যদিও কত টাকা আদায় হয়েছে, তার তথ্য জানা যায়নি।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কী ধরনের অনিয়ম ও অপচয় হয়, তার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় নারীশিক্ষার জন্য দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ নিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জমা দেওয়া ডিআইএর এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে পরিচালনা কমিটির সদস্য, অধ্যক্ষ এবং শিক্ষক-কর্মচারীরা মোট প্রায় ২১ কোটি ৮৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ‘সম্মানী’ হিসেবে নিয়েছেন। কিন্তু এই টাকার বিপরীতে ২ কোটি ১৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা উৎস কর বাবদ পরিশোধ করেননি। প্রতিবেদনে এই টাকা আদায় করতে বলা হয়েছে।

কেনাকাটায় অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের তারাবোর একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৬০ জোড়া হাই বেঞ্চ কেনার কাজে ৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া তারাবোর ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভিকারুননিসার বসুন্ধরা কলেজ শাখায় ১২০ জোড়া এবং ইংরেজি ভার্সনে ৭০ জোড়া বেঞ্চ কেনা হয়। এর জন্য মোট ১১ লাখ ১৬ হাজার টাকা নিয়ম ভেঙে ব্যয় করা হয়। আবার বেইলি রোড শাখায় ১ কোটি ৭১ লাখ টাকার সংস্কারকাজ করা হয় দরপত্র ছাড়া। এই বিল পরিশোধে অস্পষ্টতা উল্লেখ করে কমিটি একে বিধিসম্মত নয় বলেছে। বসুন্ধরা শাখায় নির্মাণকাজে ১ কোটি ৫৯ লাখ ১১ হাজার টাকার ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নিরীক্ষা দল। তারা বলেছে, এ কাজে কোনো ধরনের দরপত্রের কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন উপকরণ বিভিন্ন দোকান থেকে কেনা হলেও একটি প্রতিষ্ঠানের নামে চেক দেওয়া হয়। এভাবে বার্ষিক খেলাধুলার বিল-ভাউচার ছাড়াই ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়; যা আত্মসাৎ হিসেবে প্রতীয়মান। কেনাকাটায় এসব অনিয়মের ঘটনাগুলো ঘটে ২০১৯ ও ২০২০ সালে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনার কমিটির সদস্য ও কোনো কোনো অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকের হাত ধরেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন