বাংলাদেশে হামের ফিরে আসা: তবে এই প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধযোগ্য ছিল
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে (বিএমজে) গত বুধবার একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এটি লিখেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষক রুবহানা রকীব এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষক মাহমুদুর রহমান। পাঠকদের জন্য নিবন্ধটি বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হলো।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্যের জন্য গর্ব করে আসছে। দেশটি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) জন্য বিশ্বজুড়ে নেতৃস্থানীয় হিসেবে স্বীকৃত, যা ২০১০-এর দশক থেকে সব ধরনের শিশু টিকার ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশের বেশি কভার করার মাইলফলক অর্জন করেছে।
২০১২ সালে হাম রুবেলার সম্মিলিত টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) চালুর পর থেকে, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশটিতে এই টিকা ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কভার করেছিল। অবশ্য কোভিড মহামারির সময় এতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল।
তবে বাংলাদেশ বর্তমানে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয় এবং দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজারের বেশি হামের উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এই রোগ মূলত ৫ বছরের কম বয়সী যেসব শিশু টিকা নেয়নি, তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতির দিকে ইঙ্গিত করছে। তবে এই প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য ছিল, যা অস্থিতিশীল এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। এটি যেন আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।
বর্তমান সংকটের কারণ কী। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করেছে। সে সময় ধর্মঘট, গণবিক্ষোভসহ ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এসব ঘটনা স্বাভাবিক টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত করেছে। হাম রুবেলার যে গণটিকাদান কর্মসূচি সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর আয়োজন করা হয়, তা এবার হয়নি। সর্বশেষ কর্মসূচি ২০২০ সালে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
স্বাস্থ্য খাতের বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন পদ কয়েক মাস ধরে শূন্য ছিল। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিও (ইপিআই) ঢেলে সাজানো হয়েছিল। প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও দূরদর্শিতার ব্যাপক অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তহবিল ছাড় ও বরাদ্দে ঘাটতির পাশাপাশি টিকা ও জরুরি ওষুধ কেনা এবং সরবরাহের অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়াও ছিল ধীরগতির।
এসব কারণে টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়। স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘাটতির খবরও পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে অর্ধেকের বেশি জেলায় ৪৫ শতাংশ পদ শূন্য ছিল। কর্মরত কর্মীদের চলমান ধর্মঘট পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে, তা ছাড়া ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের প্রভাব এবং বিদেশ থেকে এই রোগ সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি শনাক্ত করতে নীতিনির্ধারকেরা ব্যর্থ হয়েছেন।
সরকার বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে টিকাদানসহ নিয়মিত স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু বেসরকারি খাত থেকে তা সংগ্রহ করে না; যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার যদি উভয় সরকারি–বেসরকারি দুই অংশ থেকেই তথ্য সংগ্রহ করত, তবে টিকার সরবরাহ এবং তা গ্রহণের হারের ওপর নজর রাখা তুলনামূলক সহজ হতো।
এপ্রিলের শুরুতে হাম রুবেলার টিকাদানে দেশব্যাপী জরুরি কর্মসূচি শুরু করা হয়, যেখানে প্রথম ডোজ গ্রহণের বয়স কমিয়ে ছয় মাস করা হয়। সরকার নজরদারি ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে (যেমন পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালু)। একই সঙ্গে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে।
সরকার আশা করছে, এসব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে শিগগিরই এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু এই বিপর্যয় ছিল পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। বর্তমান সংকট থেকে আমাদের অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে। সংক্রমণের ধরন ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স পর্যবেক্ষণ করতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্ক আগে থেকে ধারণা পেতে সরকারের উচিত রোগ নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা।
অগম্য বা দুর্গম এলাকায় টিকা পৌঁছে দেওয়ার উদ্ভাবনী পদ্ধতি নিয়ে গবেষণাকে সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা দূর করতে এবং পরিবারগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরিতেও কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিগুলোতে সাধারণত গ্যাভি, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সহায়তা দিয়ে থাকে। শিশুদের জীবনের স্বার্থে যেকোনো রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও এসব কর্মসূচি অব্যাহত রাখা উচিত।