পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে বরাদ্দ বাড়লেও তা বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়ে গেছে। যাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষ এ সেবা পাচ্ছেন কম। মোট বরাদ্দের ৭২ শতাংশই যাচ্ছে শহরাঞ্চলে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশ আজ বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। পিপিআরসি সেন্টারে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, টানা তিন বছর নিম্নমুখী থাকার পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে এর সুফল সবচেয়ে বঞ্চিত ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পৌঁছানোয় বৈষম্য রয়ে গেছে। শহরাঞ্চল ও ওয়াসাকেন্দ্রিক প্রকল্পে যায় অধিকাংশ অর্থ। হাওর, চর ও উপকূলের মানুষ এখনো বরাদ্দে পিছিয়ে।
‘২০২৬-২৭ অর্থবছরে ওয়াশ খাতের এডিপি বরাদ্দ: হাওর-চরাঞ্চল উপেক্ষিত, সমতার লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে বাজেট’ শীর্ষক নীতি সংক্ষিপ্ত প্রকাশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। এতে ওয়াশ খাতের বরাদ্দ, এর কাঠামোগত বৈষম্য ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৬, ১০, ১৩ ও ১৭ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। এবার তা বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৬১৮ কোটি। তবে জাতীয় বাজেট ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বাড়লেও ওয়াশ খাতে আপেক্ষিক অংশ বেড়েছে দশমিক ১৩ শতাংশ। এ বৃদ্ধি কাঠামোগত সমস্যার সমাধান নয়।
অর্ধেক বরাদ্দই পাচ্ছে চার ওয়াসা
দেশে পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) আছে চারটি। এগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা ওয়াসা। চারটি ওয়াসার সম্মিলিত বরাদ্দ এক বছরে ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা একাই পেয়েছে ৫ হাজার ১০ কোটি টাকা, যা মোট ওয়াশ এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, এসব অর্থের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে। এতে জরুরি দরকার, এমন ক্ষেত্রগুলোতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আর বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ অধিকাংশ সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ কমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ পানির সুবিধার বাইরে। নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন সুবিধা থেকে ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ এখনো বঞ্চিত। এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) বরাদ্দ কমে যাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৪২৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। নতুন অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪০৮ কোটি ১৯ লাখ টাকায়।
নীতি সংক্ষিপ্তে এসব তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো তৈরিতে ডিপিএইচইর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া বড় উদ্বেগের কারণ।
দরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তার প্রস্তাব
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের ক্ষেত্রে বাজেটে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের বরাদ্দ ২০৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি হয়েছে। তবে হাওর এলাকার জন্য কোনো পৃথক বরাদ্দ নেই। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার বরাদ্দ কমেছে এবং চরাঞ্চল কার্যত বাজেট–কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা অর্থায়ন ব্যবস্থা না থাকায় বৈষম্য বাড়ছে। ফ্যামিলি বা স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে অতিদরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়া দরকার। ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে আরও আর্থিক ও আইনগত ক্ষমতা দিতে হবে।
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পানি, লিঙ্গবান্ধব টয়লেট ও ঋতুকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক পৃথক বাজেটের আহ্বানও জানানো হয়েছে বিশ্লেষণে। পাশাপাশি সাতক্ষীরার গাবুরার মতো লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় খাল খনন প্রকল্পকে জলবায়ু-সহনশীল সারফেস ওয়াটার পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে রূপান্তরের সুপারিশও করা হয়েছে।
বরাদ্দই সব নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি
বিশ্লেষণের বিষয়ে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বরাদ্দ এক জিনিস, আর বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার আরেক জিনিস। মনিটরিং (নজরদারি), তথ্য এবং ওয়াশের জন্য আলাদা বাজেট কোড (বিধিমালা) ছাড়া জবাবদিহি দুর্বল থেকে যায়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বড় ওয়াশ প্রকল্প এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ব্যর্থতার বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আনতে হবে।’
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রধান ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার বাইরে। তাই চ্যালেঞ্জ নীতিগত উপকরণের অভাব নয়; বরং বিদ্যমান নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং বরাদ্দকে মানুষের জন্য বাস্তব সেবায় রূপান্তর করতে না পারা।’
সংবাদ সম্মেলনে ওয়াশ খাতের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক, নাগরিক সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ওয়াটার ওয়ার্কস অ্যাসোসিয়েশন, কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর, বাংলাদেশ ওয়াটার ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক, ফ্রেশওয়াটার অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া, এন্ড ওয়াটার পভার্টি এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।