ব্যবহৃত ইঞ্জিন অয়েলের ৩০ শতাংশ নিম্নমানের, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি
দেশে ব্যবহৃত ইঞ্জিন অয়েলের প্রায় ৩০ শতাংশই নিম্নমানের ও নকল। এমন ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহারের কারণে দ্রুত বিকল হচ্ছে যানবাহন ও শিল্পের যন্ত্রপাতি। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আজ মঙ্গলবার প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলের প্রভাব: ঝুঁকিতে ইঞ্জিন, অর্থনীতি ও পরিবেশ’ শীর্ষক এক সংলাপে এ তথ্য উঠে আসে। লুব্রিকেন্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এমজেএল বাংলাদেশ ও প্রথম আলো যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে।
আলোচনায় জানানো হয়, দেশে ইঞ্জিন অয়েলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন। এর মধ্যে বৈধ কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টন। বাকি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাজার অবৈধ কারখানায় উৎপাদিত বা ব্যবহৃত তেল প্রক্রিয়াজাত করা পণ্যের দখলে। এসব নিম্নমানের পণ্য অনেক সময় নামী ব্র্যান্ডের মোড়কে বাজারে বিক্রি করা হয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহারে ইঞ্জিনের আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তখন ঘন ঘন মেরামত ও যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। শিল্পকারখানার জেনারেটর বা মেশিনারি হঠাৎ বিকল হয়ে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। পাশাপাশি মানহীন তেলে জ্বালানি সঠিকভাবে না পোড়ায় ক্ষতিকর গ্যাস ও অতিক্ষুদ্র কণার নির্গমন বেড়ে বায়ুদূষণ ঘটছে। পরিত্যক্ত ইঞ্জিন অয়েল যত্রতত্র ফেলায় মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে।
শুধু অভিযান নয়, নজরদারি দরকার
শুধু অভিযান চালিয়ে বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া। তিনি বলেন, দেশে লুব্রিকেন্ট ও ইঞ্জিন অয়েলের ব্যবসা ও উৎপাদনের জন্য বিইআরসির লাইসেন্স নিতে হয়। বাজারে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান থাকায় সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা ও জনবলের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং ও কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করা হলে যানবাহন ও যন্ত্রপাতির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। নিয়মিত নজরদারি, মান যাচাই, জনসচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ধারাবাহিক সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলের ব্যবহার কমানো সম্ভব।
নিম্নমানের ও নকল ইঞ্জিন অয়েল ঠেকানো বিএসটিআইয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক। তিনি বলেন, বিএসটিআই বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি চালায় এবং যেসব বাজার বা এলাকায় নকল পণ্যের ঝুঁকি বেশি, সেসব জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে। তবে দেশের হাজার হাজার উৎপাদক ও বিপুলসংখ্যক বিক্রেতার ওপর নিয়মিত নজরদারি করা সীমিত জনবল দিয়ে কঠিন।
এই বিপুলসংখ্যক পণ্য ও বিক্রেতার বাজার তদারকিতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন কাজী ইমদাদুল হক। তাঁর মতে, শুধু অভিযান নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং সামাজিক সচেতনতাই নকল ও নিম্নমানের পণ্যের বিস্তার কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে
নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলের বাজার নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ইঞ্জিন অয়েল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদন, পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে নজরদারি প্রয়োজন। এটি শুধু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একক দায়িত্ব নয়; সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বন্ধ করতে হবে জালিয়াতির উৎস
ইঞ্জিন অয়েলের মানদণ্ড আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন এমজেএল বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুকুল হোসেন। একই সঙ্গে বাজারে নকল তেল খুঁজে শুধু অভিযান চালানোর বদলে এর উৎস বন্ধ করা জরুরি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ঢাকার আশপাশে ৩০ থেকে ৪০টি ছোট কারখানায় ব্যবহৃত তেল প্রক্রিয়াজাত করে নকল তেল তৈরি ও বাজারজাত করা হচ্ছে। তাই গাড়ির মালিকদের সচেতন হয়ে নির্ভরযোগ্য পরিবেশক বা দোকান থেকে ইঞ্জিন অয়েল কেনা উচিত। তাঁদের পণ্যে নিরাপত্তা সিল ও কিউআর কোড যুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পণ্যটি আসল কি না, যাচাই করা যায় বলেও জানান তিনি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, নকল পণ্য কোথা থেকে আসছে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানেন। তাই শুধু বাজারে অভিযান না চালিয়ে উৎসেই এসব পণ্য বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করার কারণেই নকল পণ্যের বিস্তার ঘটছে; আর আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস পর্যায়ে নকল বা নিম্নমানের পণ্য কীভাবে ছাড়পত্র পাচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলের বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক এবং বাইকবিডির প্রতিষ্ঠাতা শুভ্র সেন। তাঁদের মতে, এ খাতে আলাদা আলাদা সংস্থার বিচ্ছিন্ন তদারকির বদলে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে লাইসেন্স, উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ তদারকি করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাজার থেকে ইঞ্জিন অয়েলের বোতল বা প্যাকেট সংগ্রহ করে নিয়মিত দৈবচয়নভিত্তিক (র্যান্ডম) ল্যাব পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ব্যবহৃত বা খালি ইঞ্জিন অয়েলের বোতল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেগুলোতে নকল তেল ভরে আবার বাজারজাত করার সুযোগ বন্ধ করা এবং ব্যবহৃত তেল সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট চ্যানেল তৈরির কথাও বলেন বক্তারা।
প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রওশন মমতাজ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন এবং হাইড্রোকার্বন ইউনিটের উপপরিচালক মেহেদী হাসান। শুরুতে সংলাপের মূল বিষয়বস্তুর ওপর উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রথম আলোর বিজনেস সাপ্লিমেন্টের প্রধান শামসুল হক মোহাম্মদ মিরাজ।