অপরিকল্পিত হকার পুনর্বাসনে বাড়তে পারে জনদুর্ভোগ: আইপিডি

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) লোগোফেসবুক থেকে নেওয়া

রাজধানীতে হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সাম্প্রতিক নীতিমালাকে স্বাগত জানালেও এর বাস্তবায়নপদ্ধতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলছে, পরিকল্পনাহীন ও অপরিণামদর্শীভাবে ফুটপাত ও সড়কে হকার বসার সুযোগ করে দিলে নগরজীবনে আরও বড় বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।

আজ শুক্রবার গণমাধ্যমে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, হকার সমস্যা শুধু ঢাকার নয়; দেশের প্রায় সব নগর এলাকাতেই এটি পথচারীদের চলাচল, নিরাপত্তা ও নগর ব্যবস্থাপনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে কেন্দ্র করে নয়, সারা দেশের নগর এলাকার জন্য সমন্বিত হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

সংস্থাটির মতে, দীর্ঘদিন ধরেই নগর এলাকায় হকার নীতিমালার প্রয়োজন ছিল। তবে নীতিমালা প্রণয়নের পর যথাযথ পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ ছাড়াই যেভাবে ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কেও দাগ টেনে হকার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বিস্ময়কর। এতে অল্প সময়ের জন্য তৈরি হওয়া পথচারীদের স্বস্তি আবারও হারিয়ে গেছে।

আইপিডি বলছে, ফুটপাত ও সড়ক নাগরিকদের চলাচলের জন্য। সেখানে বাধা সৃষ্টি করে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়ার আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত লাইসেন্স, কর ও ফি দিয়ে ব্যবসা করা দোকান ও মার্কেটের ব্যবসায়ীদের, অনেক ক্ষেত্রে হকারদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে।

নীতিমালায় পথচারীদের জন্য ন্যূনতম ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। একে ‘অপ্রতুল’ মনে করছে আইপিডি। সংস্থাটির ভাষ্য, আন্তর্জাতিক ও আধুনিক নগর-পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী বড় শহরের আবাসিক এলাকায় ৮ থেকে ১০ ফুট এবং বাণিজ্যিক এলাকায় ১০ থেকে ১৬ ফুট প্রশস্ত ফুটপাত থাকা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় এই প্রশস্ততা হওয়া উচিত ২০ থেকে ৪০ ফুট।

এ ছাড়া নতুন নীতিমালায় মেট্রোস্টেশন, বাসস্টপ বা গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ফুট দূরত্বে হকার বসার সুযোগ রাখা হয়েছে। আইপিডি বলছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সাধারণত এসব স্থানের অন্তত ১৫০ ফুটের মধ্যে হকার বসতে দেওয়া হয় না।

তবে নীতিমালার কিছু দিককে ইতিবাচক বলেও উল্লেখ করেছে আইপিডি। বিশেষ করে হলিডে মার্কেট, নৈশকালীন মার্কেট ও হকারমুক্ত এলাকা ঘোষণার বিষয়গুলোকে তারা ভালো উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। পাশাপাশি প্রান্তিক হকারদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়টিও ইতিবাচক বলে মনে করছে সংস্থাটি।

তবে হকারদের লাইসেন্স ও পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা থাকলেও বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণের বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা না থাকা এবং এলাকাভিত্তিক হকারদের তালিকা প্রকাশের ব্যবস্থা না থাকাকে বড় ঘাটতি হিসেবে দেখছে আইপিডি। এ ছাড়া হকার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নাগরিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত না করাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইপিডির দাবি, বর্তমানে যেভাবে ফুটপাত দখল করে হকাররা ব্যবসা করছেন, নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। প্রকৃত হতদরিদ্র হকারদের চিহ্নিত করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে অবৈধ দখলকে পুনর্বাসনের নামে বৈধতা দেওয়া ঠিক হবে না।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শুধু পুনর্বাসন নয়, দারিদ্র্য বিমোচনের দৃষ্টিকোণ থেকেও ভাবতে হবে। পাশাপাশি হকার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আইপিডি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এ জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন।