হামে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে প্রতিবন্ধী এক বাবার লড়াই

হামে আক্রান্ত শিশু তাজিমকে নিয়ে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে অবস্থান করছেন বাবা আসলাম দাড়িয়াকোলাজ

আসলাম দাড়িয়ার বয়স যখন তিন বছর, তখন জ্বর হয়েছিল। এর পর থেকে তাঁর দুই পা অবশ। দুই হাত ও দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে তাঁকে চলাফেরা করতে হয়। বর্তমানে তিনি তাঁর সাত মাস বয়সী ছেলে তাজিমকে নিয়ে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে অবস্থান করছেন। ছেলে ভর্তি আছে হাসপাতালটির হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। ছেলের শারীরিক অবস্থার খানিকটা উন্নতি হওয়ায় তাঁর কণ্ঠে কিছুটা স্বস্তির আভাস পাওয়া গেল।

গতকাল বৃহস্পতিবার কথা হলো আসলামের সঙ্গে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে ছেলেকে নিয়ে এসেছেন এ হাসপাতালে। তাঁর স্ত্রীও আছেন হাসপাতালে। এলাকায় অটোভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। চার ছেলে–মেয়ের মধ্যে তাজিম সবার ছোট। ছেলেটি বর্তমানে আইসিইউর ৯ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন। আসলাম হামাগুড়ি দিয়েই আইসিইউতে গিয়ে ছেলেকে দেখে আসেন।

আসলাম বলেন, ‘এখানকার ডাক্তাররা বলছেন, ছেলের অবস্থা নাকি এখন মোটামুটি ভালো।’

গত শনিবার হাসপাতালটিতে ভর্তির আধা ঘণ্টার মধ্যেই ছেলেকে চিকিৎসকেরা আইসিইউতে ভর্তি করেন।

হামে আক্রান্ত শিশু তাজিম
ছবি: তাজিমের বাবার কাছ থেকে পাওয়া

জ্বর-কাশি-নিউমোনিয়া-হাম নিয়ে তাজিমকে প্রথমে কোটালীপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করতে হয়েছিল। সেখানে এক দিন থাকার পর তাকে গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা ছেলেকে ঢাকায় নিতে বলেন। ঢাকার এ হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তির পর চিকিৎসকেরা তিনটি ইনজেকশন দিতে হবে বলে জানান। একেকটি ইনজেকশনের দামই ১৫ হাজার টাকা। এতে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন আসলাম।

আসলাম বলেন, অটোভ্যান চালিয়ে যা আয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। ছেলের হামের চিকিৎসায় প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। ধারদেনা করেই এ টাকা জোগাড় করেছেন। একটি ইনজেকশন নিজে কিনেছেন। এর আগে হাসপাতালের এক নারী চিকিৎসক কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন।

গতকাল সকালে হাসপাতালটিতে যান ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, অটোভ্যানচালক আসলাম টাকার অভাবে ছেলের চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে জেলা প্রশাসন এই ভ্যানচালকের ছেলের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে।

হামে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে সাত মাস বয়সী ছেলে তাজিম। বাইরে বাবা আসলাম। গতকাল বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে
ছবি: প্রথম আলো

আসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে আমার হাতে ৫০ হাজার টাকা দিয়া গেছেন। এরপর চিন্তাটা একটু কমছে। জেলা প্রশাসক ম্যাডাম বলছেন, এরপর কিছু লাগলে তাঁরে জানাইতে।’

আসলাম বলেন, তাঁর ছেলে তাজিমের জন্মের পর থেকেই নানান অসুখ লেগেই আছে। এখন হামের জটিলতায় অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এখন ছেলেকে সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন কি না, সেই চিন্তায় আছেন।

আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

হাম ও হামের উপসর্গে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাত শিশু মারা গেছে। এই সময়ে হামে মারা গেছে তিন শিশু, আর হামের উপসর্গে মারা গেছে চার শিশু। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, বুধবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ে এই শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ৪২৩ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ৫৯ হাজার ২৭৯।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্তের সংখ্যা ২০৮। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৮ হাজার ২৭৫ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৬ হাজার ৪০৭ শিশু। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৪২ হাজার ৩৩৬ শিশু।

১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৪০৫ শিশু, আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৮৩ শিশু। মোট মৃত্যু ৪৮৮।