দেশে প্রতি চারটি শিশুর একটি খর্বকায়, নজর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
পুষ্টির উন্নতির নামে ফাঁকা বুলি আওড়ানো হয়েছে। দেশে প্রতি চারটি শিশুর একটির উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু খাদ্যের অভাব বা বারবার সংক্রমণের কারণে শিশু খর্বকায় হয়—এটি সর্বাংশে সত্য নয়, কারণ আরও আছে।
আজ সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পুষ্টি অন্তর্ভুক্তকরণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব–বিষয়ক একটি গোলটেবিল বৈঠকে নীতিনির্ধারক ও পুষ্টিবিজ্ঞানীরা এ কথা বলেন। পুষ্টিবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এ বৈঠকের আয়োজন করে। এতে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দীন হায়দার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পুষ্টিবিষয়ক সরকারি কর্মকর্তা, পুষ্টিবিজ্ঞানী, গবেষক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের সচিবালয়প্রধান সায়কা সিরাজ। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে ত্রিমাতৃক অপুষ্টি দেখা যাচ্ছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪ শতাংশ শিশুর উচ্চতা কম, অর্থাৎ প্রতি চারটি শিশুর মধ্যে একটি শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। আর ১৩ শতাংশ শিশু কৃশকায়।
দেশের ৫৩ শতাংশ গর্ভবতী নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন জানিয়ে সায়কা সিরাজ বলেন, আবার প্রজননক্ষম বয়সী ৫৬ শতাংশ নারী স্থূলকায়। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার জন্য মানুষ নানা স্তরের হাসপাতালে যায়, কিন্তু পুষ্টির জন্য কোথাও যায় না। পরিবার ও পুষ্টিসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সায়কা সিরাজ বলেন, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে পুষ্টিসেবা দেয়। কিন্তু এসব সেবার মান যেমন জানা যায় না, তেমনি এর কোনো হিসাবও নেই। পুষ্টির বিষয়ে দেশে গ্রহণযোগ্য তথ্য-উপাত্তের জন্য তথ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, শুধু খাবারের অভাব বা বারবার সংক্রমণের কারণে শিশুদের উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম হয়, বিষয়টি এতটা সরল নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের উচ্চতায় বড় ভূমিকা রাখে বিশুদ্ধ পানি, পয়োব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধি। শিশুরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে হামাগুড়ি দিলে, অপরিষ্কার হাত মুখে দিলে ক্ষতিকর জীবাণু শিশুর অন্ত্রকে ক্ষতি করে, যা শিশুর উচ্চতায় প্রভাব ফেলে।
এই পুষ্টিবিজ্ঞানী বলেন, গবেষণায় খর্বকায় শিশুর সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের সম্পর্ক দেখা গেছে। বিজ্ঞানবিষয়ক খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, জিডিপির ১ থেকে ২ শতাংশ বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে দিলে খর্বকায় শিশুর হার ২০ শতাংশ হয়। আর বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ করলে খর্বকায় শিশুর হার কমে ১২ শতাংশ হতে দেখা গেছে। তাহমিদ আহমেদ বলেন, দেশে তীব্র মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত প্রায় চার লাখ শিশু।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দীন হায়দার বলেন, পুষ্টির বিষয়ে ভালো কোনো নীতি বা দৃঢ় কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল না। পুষ্টির চালকের আসনে ছিল দাতারা। ১৯৯১ সালে পুষ্টির যে পরিস্থিতি ছিল, এত বছর তার থেকে বেশি উন্নতি হয়নি।
বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা তুলে ধরে জিয়াউদ্দীন হায়দার বলেন, গ্রামে প্রতিটি ইউনিয়নে ও শহরে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিট করা হবে। প্রতিটি ইউনিটে ৯ জন করে স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন। প্রতিটি ইউনিটে একটি অংশে চিকিৎসাসেবা, অন্য প্রতিরোধমূলক সেবা দেওয়া হবে। এই সেবার মধ্যে পুষ্টিসেবাও থাকবে। এসব সেবা সহজ করার জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়া হবে। তিনি জানান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ে ৪৩ হাজার কর্মী আছে, আরও এক লাখ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ইউনূস আলী শেখ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশনের (গেইন) কান্ট্রি ডিরেক্টর রুদাবা খন্দকার প্রমুখ বক্তব্য দেন।