৪৫% শিশু ঠিকমতো মায়ের দুধ পাচ্ছে না
২০২০ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল প্রথম।
বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ।
২০১৭-১৮ সালে ৬৫% শিশু ঠিকমতো মায়ের দুধ পেত।
বর্তমানে ৫৫ শতাংশ শিশু ঠিকমতো মায়ের দুধ পায়।
দেশে প্রয়োজনমতো মায়ের দুধ পান করা শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কম। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ পায় ৫৫ শতাংশ শিশু, পায় না ৪৫ শতাংশ শিশু। হাসপাতালগুলোতে আইন না মেনে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য রাখা হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে সেমিনারে শিশুস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞরা এ তথ্য দেন। বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে। এতে জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞ, শিশুস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞ, প্রসূতি রোগ–বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং পুষ্টিবিজ্ঞানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। প্রতিবছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হয়।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর মাতৃদুগ্ধের গুরুত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে চলে এসেছে। হামে আক্রান্ত অনেক শিশু জন্মের পরপরই শালদুধ খায়নি, অথবা জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খায়নি—এসব কথা চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। শিশুস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞরা বলেন, মায়ের দুধ টিকার কাজ করে।
সেমিনারে বিবিএফের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণের ফলাফল তুলে ধরে বলা হয়, স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে ব্রেস্টফিডিং কর্নারের মতো শিশুকে মায়ের দুধ পান করানোর বেশ কিছু উদ্যোগ ছিল। সেসব উদ্যোগ এখন অনেক ঝিমিয়ে পড়েছে।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর মাতৃদুগ্ধের গুরুত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে চলে এসেছে। হামে আক্রান্ত অনেক শিশু জন্মের পরপরই শালদুধ খায়নি, অথবা জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খায়নি—এসব কথা চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। শিশুস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞরা বলেন, মায়ের দুধ টিকার কাজ করে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও বিবিএফের পরিচালক খুরশিদ জাহান উপস্থাপনায় বলেন, দেশে মাতৃদুগ্ধ পান করা শিশুর হার কমেছে। এখন ৫৫ শতাংশ শিশু জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ পান করে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৬০ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা আছে। তিনি বলেন, মাতৃদুগ্ধ পান কমে যাওয়া মায়ের ব্যর্থতা নয়, হাসপাতাল বা ক্লিনিকে সেবার ঘাটতি, অস্ত্রোপচারে প্রসবের পর ঠিক পরিচর্যা না পাওয়া, মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া—এই ধরনের মাতৃত্ব সুরক্ষার ঘাটতির সম্মিলিত কারণে শিশুদের মায়ের দুধ পান করা কমেছে।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধ পানের হার নিকট অতীতে ভালোই ছিল। ২০২০ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল প্রথম। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ পানের শিশু ছিল ৬৫ শতাংশ, বর্তমানে ৫৫ শতাংশ।
এ বছর মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’–এর ওপর বক্তব্য দেন বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ ও অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক এস কে রায়। তিনি বলেন, মাতৃদুগ্ধ পানকে টেকসই করতে হলে চারটি স্তম্ভ বা শর্ত মানতে হবে। এগুলো হলো মায়ের দুধ পান করানোর স্থায়ী ও কার্যকর পরিবেশ তৈরির তথ্য সরবরাহ; মায়ের দুধ পান করানোর সহায়তা কার্যক্রমগুলোকে উদ্দীপিত, সক্রিয় ও গতিশীল করা; মাতৃদুগ্ধ পান করানোর সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে মাকে সম্পৃক্ত করা; এবং সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজের সমন্বয় করা।
মাতৃদুগ্ধ পানকে সুরক্ষা, উৎসাহ ও সমর্থন করার জন্য দেশে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য আইন ২০১৩ ও বিধিমালা ২০১৭ আছে। এই আইন ও বিধিমালার উদ্দেশ্য হচ্ছে—মাতৃদুগ্ধের বিকল্প পণ্যের অনৈতিক বিপণন নিয়ন্ত্রণ করা। মূল উদ্দেশ্য শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এস কে রায় বলেন, সূচকের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি পরিমাপের ব্যবস্থা আছে। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ অতীতের চেয়ে খারাপ করছে। এই পুষ্টিবিদ বলেন, ‘যা মাপা যায়, তা–ই উন্নত করা যায়। সুতরাং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি জরুরি।’
অনুষ্ঠানে বলা হয়, দেশে আইন আছে, সেই আইন মানা হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি এক হাজারের বেশি হাসপাতালকে ‘শিশুবান্ধব হাসপাতাল’ করা হয়েছিল। হাসপাতালগুলো সেই চরিত্র হারিয়েছে। ১০০ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মীর মাতৃদুগ্ধের বিষয়ে প্রশিক্ষণদক্ষতা আছে; কিন্তু তাঁদের কাজে লাগানো হচ্ছে না। গণমাধ্যমও মাতৃদুগ্ধের বিষয়গুলোতে পিছিয়ে আছে।
মাতৃদুগ্ধ পানকে সুরক্ষা, উৎসাহ ও সমর্থন করার জন্য দেশে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য আইন ২০১৩ ও বিধিমালা ২০১৭ আছে। এই আইন ও বিধিমালার উদ্দেশ্য হচ্ছে—মাতৃদুগ্ধের বিকল্প পণ্যের অনৈতিক বিপণন নিয়ন্ত্রণ করা। মূল উদ্দেশ্য শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এখন পরিস্থিতি কী
বিবিএফ ১৯৮৯ সাল থেকে মাতৃদুগ্ধ পান সুরক্ষা, মাতৃ ও শিশুপুষ্টি, শিশুর সঠিক পরিপূরক খাদ্য, কিশোরী পুষ্টি নিয়ে কাজ করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে বিবিএফ ১২টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ৪০টি বাজারের ওষুধের ২৬০টি দোকান এবং ৪৮টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করে। অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে ফলাফল উপস্থাপন করেন বিবিএফের ভাইস চেয়ারপারসন অধ্যাপক সুফিয়া খাতুন।
সুফিয়া খাতুন বলেন, পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে আইন লঙ্ঘন করে ১০০ শতাংশ দোকানে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প পণ্য প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়। এসব দোকানের প্রায় ৫ শতাংশ পণ্য পাওয়া গেছে, যার নিবন্ধন নেই বা নিবন্ধনপ্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ। ১০০ শতাংশ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চিকিৎসা বা পুষ্টি পরামর্শের আড়ালে বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচার করা হয়। কোম্পানিগুলো সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার বা স্যাকমোদের মাধ্যমে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির টিকাকেন্দ্র বা প্রসবপূর্ব সেবার সময় বিকল্প খাদ্যের প্রচার চালায়।
ওই একই সময়ে বিবিএফ শিশুবান্ধব ১২টি হাসপাতাল পর্যবেক্ষণ করে এবং ৭২ চিকিৎসক ও নার্সের সাক্ষাৎকার নেয়। সেই পর্যবেক্ষণের তথ্য তুলে ধরে সুফিয়া খাতুন বলেন, সব কটি বা ১০০ শতাংশ হাসপাতালে ‘শিশুবান্ধব হাসপাতাল কমিটি’ অনুপস্থিত বা অকার্যকর দেখা গেছে। ১০০ শতাংশ হাসপাতালে কার্যকর ব্রেস্টফিডিং কর্নার ছিল না। প্রায় সব হাসপাতালেই শিশুখাদ্যের প্রচার ও আইনের লঙ্ঘন দেখা গেছে। কোনো হাসপাতালে জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই।
অনুষ্ঠানে একাধিক আলোচক মায়ের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, মায়ের দুধ প্রথম ৬ মাস শিশুর প্রয়োজনীয় সব খাদ্য ও পানির চাহিদা পূরণ করে; ৬ থেকে ১২ মাসে শিশুর অর্ধেক বা তার বেশি শক্তির চাহিদা পূরণ করে, ১২ থেকে ২৪ মাসে শক্তি চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করে।
সুফিয়া খাতুন সরকার, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে শিশুর মা–বাবারা যাঁদের দেবতার মতো মানেন, যাঁদের কথা নির্বিঘ্নে মেনে নেন, তাঁরাই শিশুখাদ্যের প্রচার করছেন। মাকে বুকের দুধ পান করানো না শিখিয়ে তাঁদের হাতে শিশুখাদ্যের কৌটা তুলে দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবার–পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিন্নাত রেহানা বলেন, মাকে কোনো অবস্থাতেই দোষারোপ করা যাবে না, মাকে সহায়ক পরিবেশ দিতে হবে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান সামিনা আহমেদ বলেন, স্কুল পাঠ্যক্রমে অন্তত এক প্যারা মাতৃদুগ্ধের উপকারিতার বিষয়ে থাকা উচিত।
বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, জাতীয় পুষ্টিনীতি হালনাগাদ করা হচ্ছে, সেখানে শিশুপুষ্টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক রওশন জাহান আখতার বলেন, আইন মান্য করা হচ্ছে কি না, তা কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, সম্প্রতি ১৪০টি সরকারি হাসপাতালে নতুনভাবে ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়েছে।
সেমিনারের আরও বক্তব্য দেন নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ইফফাত আরা শামসাদ।
কেন মায়ের দুধ গুরুত্বপূর্ণ
অনুষ্ঠানে একাধিক আলোচক মায়ের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, মায়ের দুধ প্রথম ৬ মাস শিশুর প্রয়োজনীয় সব খাদ্য ও পানির চাহিদা পূরণ করে; ৬ থেকে ১২ মাসে শিশুর অর্ধেক বা তার বেশি শক্তির চাহিদা পূরণ করে, ১২ থেকে ২৪ মাসে শক্তি চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করে।
বিবিএফের মহাসচিব অধ্যাপক সানিয়া তাসনিম বলেন, মায়ের দুধ শুধু খাদ্য নয়, এটি জীবন্ত জৈবিক ব্যবস্থা। শিশুর অন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে। জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের শালদুধ খাওয়ালে নবজাতকের মৃত্যু ৩১ শতাংশ কমে। নিয়মিত মায়ের দুধ পান করা শিশুদের ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১৫ গুণ, নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১১ গুণ এবং অপুষ্টিজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১৪ গুণ কমে।
