‘জুলাই বিপ্লবের’ পরে যে নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। ‘বিপ্লবের’ ইশতেহার না দেওয়া, আমলাতন্ত্র ও প্রশাসন থেকে ফ্যাসিস্টের দোসরদের না সরানোসহ এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তাই ‘বিপ্লব’ খারাপ সময় পার করছে। যদিও প্রত্যাশিত পরিবর্তনের সময় এখনো আছে—জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের (জেআরএ) আলোচনা সভায় এসব কথা উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালা সেমিনার কক্ষে ‘সব লোকে কয় বেহাত জুলাই বিপ্লব’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভায় ‘জুলাই বিপ্লবের’ মূল আদর্শের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য সমাধানের পথ নিয়ে আলোকপাত করেন বক্তারা। এ বিষয়ে কাজ করা ১০টি সংগঠনের সদস্য এবং এ সময় আহত ব্যক্তিরা এই সভায় উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (পুনাব) সদস্যসচিব আসিফ রেজা বলেন, ‘এখনই ব্যবস্থা না নিলে বিপ্লব বেহাত হবে। ভ্রাতৃত্বের জায়গা থেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৮ জুলাই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিল। কিন্তু তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যসচিব আরিফ সোহেল বলেন, ‘বিপ্লব খারাপ সময় পার করছে, তবে বিপ্লব আবারও উঠে দাঁড়াবে। প্রত্যাশিত পরিবর্তনের সময় এখনো আছে। বিপ্লবীরা তৈরি হচ্ছে।’
জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হলে সেটা অনুযায়ী চলার মনোবল থাকতে হবে জানিয়ে আরিফ সোহেল আরও বলেন, ‘বিপ্লবী হব কি না, সেটা নিজেদেরই ঠিক করতে হবে। আপসহীন হতে হবে।’
‘ছত্রিশ’ সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি আবু সাদিক কায়েম বলেন, ‘চোখের সামনে ভাই–বোনদের হারাতে দেখেছি। আমরাও শহীদ হতে রাস্তায় নেমেছিলাম। যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম, সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির জায়গায় অনেক বেশি ফারাক।’
ফ্যাসিবাদ–ব্যবস্থার বিলোপ করার জন্য আমূল কোনো পরিবর্তন হলো না, সেটার দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবু সাদিক কায়েম আরও বলেন, ‘দেশের প্রশ্নে এক হতে পারি, সেটা তো প্রমাণিত। তাহলে বিভাজনটা করছে কে? প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা থেকে ফ্যাসিবাদের দোসরদের হটাতে হবে।’
স্পিক বাংলাদেশের প্রধান মুখপাত্র মুহাম্মদ সজল বলেন, ‘এই এনজিও সরকারকে ঠেলে ঠেলে কাজ করাতে হয়। আসলে তাদের তো আন্দোলনের হাতেখড়ি হয়নি। তাই নিজেদের বৈধতার জন্য এই সরকার পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমাদের দেশে বিপ্লবের থেকেও বড় কিছু ঘটেছে। কিন্তু এই ইনকিলাব শুধু আমাদের মনের ভেতর। এটাকে সংবিধান, বই–পুস্তক এবং মাঠে–ময়দানে আনতে হবে।’
জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের যুগ্ম আহ্বায়ক আহমদ সামরান বলেন, ‘আমাকে জেলে রাখা হয়েছিল। আমরা ১৫ তারিখে জেল ভেঙে আন্দোলনে শরিক হওয়ার পরিকল্পনা করেছি। আমরা কেউই পিছু হটতাম না। যারা ফ্যাসিস্ট সিস্টেম এবং ’৭২–এর সংবিধান বাতিল চায় না, তারাই ক্যান্টনমেন্টে উপস্থিত হয়েছে। এ জন্যই বিপ্লবী সরকার হয়নি।’
বাংলাদেশ প্রটেস্ট আর্কাইভের সহপ্রতিষ্ঠাতা শোয়েব আবদুল্লাহ বলেন, ‘অনেকেই বিপ্লব নিয়ে প্রশ্ন করেন। পেশাগত কারণেই আমি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করি। কাজ করতে গিয়েই অনেক বিপ্লবের ভিডিও দেখেছি। মারণাস্ত্রের বিপরীতে শূন্য হাতে আন্দোলন বাংলাদেশের বাইরে শুধু গাজায় হয়েছে।’
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ উসমান বিন হাদি বলেন, ‘রাজনীতি সংস্কৃতিকে তৈরি করে না। বরং সংস্কৃতি রাজনীতিকে তৈরি করে। জুলাইকে আমাদের ফ্যাশনের সঙ্গে একীভূত করতে হবে। আর সরকারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নারী শিক্ষার্থী এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি রাখতে হবে।’