অর্থায়নসংকট বিশ্বজুড়ে এইডস প্রতিরোধ কর্মসূচিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে
জাতিসংঘের এইডস কর্মসূচি ইউএনএইডসের ‘গ্লোবাল এইডস আপডেট ২০২৫’ প্রতিবেদন বলছে, বিশ্ব এইচআইভি পরিস্থিতিতে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও হঠাৎ আন্তর্জাতিক অর্থায়নসংকট সেই অর্জনকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। নতুন সংক্রমণ কমছে, চিকিৎসার আওতা বাড়ছে, কিন্তু এশিয়াসহ অনেক অঞ্চলে এই উন্নতি ধীর, অসম এবং এখন আবার উল্টো পথে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ৮ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করেছেন, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে—সংখ্যায় প্রায় ৬৯ লাখ। একই বছরে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আনুমানিক ১৩ লাখ মানুষ, যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এশিয়ার দেশগুলোতে।
যদিও ২০১০ সালের তুলনায় বৈশ্বিকভাবে নতুন সংক্রমণ ৪০ শতাংশ কমেছে, এশিয়ায় এই হার মাত্র ১৭ শতাংশ, অর্থাৎ অগ্রগতি অনেক ধীর।
ইতিবাচক দিক হলো ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ১৬ লাখ মানুষ নিয়মিত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসা পেয়েছেন, যা মোট আক্রান্তের ৭৭ শতাংশ।
চিকিৎসার ফলে এইডসজনিত মৃত্যুও নাটকীয়ভাবে কমেছে। তবে এখনো ৯২ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না, যার এক-চতুর্থাংশই এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বসবাস করেন।
বিশেষ উদ্বেগের জায়গা শিশুদের অবস্থা। বিশ্বজুড়ে এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৪৫ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে এবং ২০২৪ সালে এইডসজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশ শিশু। যদিও মা থেকে শিশুর সংক্রমণ রোধে বড় অগ্রগতি হয়েছে, অর্থায়নসংকটে এই সাফল্যও হুমকিতে পড়েছে।
কোথায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
রিপোর্ট বলছে, আজকের এইচআইভি মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তথাকথিত ‘কী পপুলেশন’, যেমন সমকামী পুরুষ, যৌনকর্মী, মাদক ইনজেকশন ব্যবহারকারী মানুষ এবং তাঁদের সঙ্গীরা। সাব-সাহারান আফ্রিকার বাইরে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ নতুন সংক্রমণ এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেই হচ্ছে। তবু প্রতিরোধ কর্মসূচিতে তাঁদের জন্য বরাদ্দ হচ্ছে মোট এইচআইভি তহবিলের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ।
এশিয়ার অনেক দেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এই ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। প্রতিরোধ কার্যক্রম দুর্বল, কনডম কর্মসূচি ও প্রিএক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (পিআরইএফ) এখনো পর্যাপ্তভাবে বিস্তৃত হয়নি।
হঠাৎ অর্থায়নসংকট: অর্জনের ওপর বড় আঘাত
সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা এসেছে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন হঠাৎ কমে যাওয়াকে ঘিরে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পেপফার কর্মসূচির তহবিল স্থগিত বা কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী চাকরি হারিয়েছেন, বন্ধ হয়েছে অসংখ্য প্রতিরোধ ও পরীক্ষাকেন্দ্র।
শুধু প্রতিরোধ নয়, এই তহবিলসংকটে ওষুধ সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। রিপোর্টের একাধিক কেস স্টাডিতে দেখা যায়, মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ওষুধ না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে, যা ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইউএনএইডসের পূর্বাভাস আরও ভয়াবহ
এই সংকট স্থায়ী হলে ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৬৬ লাখ নতুন সংক্রমণ ঘটতে পারে বিশ্বজুড়ে। ইউএনএইডসের নির্বাহী পরিচালক উইনি বিয়ানইয়িমা এই প্রতিবেদনের সঙ্গে দেওয়া তাঁর মন্তব্যে বলেন, ২০২৫ সালের শুরুতে বৈশ্বিক এইচআইভি মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় একক অর্থদাতার হঠাৎ সরে দাঁড়ানো বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এইচআইভি প্রতিরোধ কার্যক্রমের প্রায় ৮০ শতাংশই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ইউএনএইডসের মডেলিং অনুযায়ী, এই অর্থায়ন যদি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ২০২৯ সালের মধ্যে অতিরিক্ত প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হতে পারে এবং আরও প্রায় ৪০ লাখ মানুষের এইডসজনিত মৃত্যু ঘটতে পারে। একই সময়ে এইচআইভির ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এমন দেশের সংখ্যাও ইউএনএইডস রিপোর্টিং শুরু করার পর এই প্রথমবারের মতো বেড়েছে।
প্রতিরোধেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি
রিপোর্ট স্পষ্টভাবে বলছে, এইডস নির্মূলে সবচেয়ে বড় বাধা এখন প্রতিরোধ কর্মসূচির দুর্বলতা। ২০২৪ সালে দরকার ছিল বছরে প্রায় ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। ফলে যে একজন প্রতিরোধ সেবা পেয়েছে, তার বিপরীতে তিনজন সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে।
এশিয়াসহ বহু অঞ্চলে এই প্রতিরোধ কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। অর্থায়ন কমতেই সবচেয়ে আগে বন্ধ হচ্ছে কনডম বিতরণ, সচেতনতা কর্মসূচি, সেবা ও কমিউনিটি আউটরিচ।
আশার আলো কোথায়
সব অন্ধকারের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক আছে। বহু দেশ ধীরে ধীরে নিজেদের বাজেট থেকে এইচআইভি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অন্তত ২৫টি দেশ ২০২৬ সালে অভ্যন্তরীণ বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশনভিত্তিক প্রতিরোধ ওষুধের মতো নতুন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিও ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষ কথা
ইউএনএইডসের বার্তা পরিষ্কার, বিশ্ব এইডস নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, কিন্তু অর্থায়নসংকট সেই যাত্রাকে আবার পিছিয়ে দিচ্ছে। এশিয়ায় অগ্রগতি এমনিতেই ধীর। এখন যদি প্রতিরোধ ও কমিউনিটি কর্মসূচি ভেঙে পড়ে, তাহলে সংক্রমণ আবার বাড়তে পারে দ্রুত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের কাছে জ্ঞান ও কার্যকর উপায় আছে এইডস শেষ করার। অভাব শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও টেকসই অর্থায়নের।