বিনিয়োগে আস্থা ফেরাতে স্থিতিশীলতার বার্তা

বিনিয়োগ সম্মেলন উদ্বোধন করে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান । ১৩ জুনছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও উন্মুক্ত গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চায় সরকার। ‘স্থিতিশীলতা, সংস্কার ও উন্নয়ন’—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন গতি আনার বার্তা দিয়েছে ঢাকা।

আজ শনিবার সকালে রাজধানীতে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিষয়ে সরকারের এমন ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে ‘রোডম্যাপ ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি (বাণিজ্য, প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির পথনকশা)’ শীর্ষক ওই সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে মূলত বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধান, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সম্মেলনে উদ্বোধনী অধিবেশনের পাশাপাশি তিনটি আলাদা কর্ম–অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও চ্যালেঞ্জকে নতুন সুযোগে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। তাঁর মতে, বর্তমান জ্বালানিসংকটের ব্যাপ্তি ১৯৭০-এর দশকের দুই দফা তেলসংকটের চেয়েও বড় হতে পারে, যা ১৯৮০-এর দশককে অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য উন্নয়নের একটি ‘হারানো দশক’ হিসেবে পরিণত করার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।

খলিলুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানিসংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অর্থায়ন ও প্রযুক্তির এই উন্নয়নের মুখে আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও একটি সুনির্দিষ্ট ভিশন বা রূপকল্প রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি চ্যালেঞ্জগুলোকে নতুন সুযোগে রূপান্তর করতে চান। এ ক্ষেত্রে তিনটি মূল লক্ষ্য হলো—স্থিতিশীলতা আনা, সংস্কার করা এবং উন্নয়ন সাধন করা। আমাদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কূটনীতির কাজের ক্ষেত্রে তাঁর এই রূপকল্পকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে।’

খলিলুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে প্রথম প্রয়োজন আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দেশীয় ব্যবসায়ী, নাগরিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব দেশ হিসেবে তুলে ধরতে সরকার কাজ করছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৩ জুন
ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বর্তমান সরকার মাত্র ১০০ দিনের কিছু বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছে। তবে আমাদের লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত সুদৃঢ়।’

মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। আমরা বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর, স্থিতিশীল ও শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করতে চাই, যেখানে প্রতে৵ক নাগরিক সমৃদ্ধি ও মর্যাদার ন্যায্য অধিকার ভোগ করবে।

উদ্বোধনী অধিবেশনে বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, আমরা সব সময় নীতির ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার কথা বলেছি। বাংলাদেশ কিংবা বিশ্বের যেকোনো দেশের বিনিয়োগকারীর কাছে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছে। তারা শুধু ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি; বরং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্বও তাদের ওপর বর্তেছে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে জোর

সম্মেলনের প্রথম কর্ম–অধিবেশনে বক্তৃতা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন (ডানে)। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম (বাঁয়ে) সঞ্চালনা করেন। ১৩ জুন
ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

সম্মেলনের প্রথম কর্ম–অধিবেশনে বক্তৃতা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঞ্চালনায় প্রথম কর্ম–অধিবেশনে বিনিয়োগ ও অর্থনীতির সঙ্গে কূটনীতির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ সময় তাঁরা সংযুক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ও তাদের যেকোনো সংকট সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাজারে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও কানেক্টিভিটি বাড়াতে কাজ করছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সরকারের সব কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।

বড় বিনিয়োগ পুঁজিবাজার থেকে

দেশের আর্থিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ এখন পুঁজিবাজারের মাধ্যমে আসা উচিত।

সম্মেলনের দ্বিতীয় কর্ম–অধিবেশনে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি পুঁজিবাজার থেকে মূলধন (ইকু৵ইটি) ও ঋণ সংগ্রহের ওপর জোর দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন এবং ঋণ গ্রহণ করা উচিত।’ বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সরকারি আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্বজুড়ে অর্থায়নের প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে এবং বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে ঋণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের খরচ বাড়ছে। এমনকি যেসব বহুপক্ষীয় ঋণদাতা আগে ১ শতাংশের নিচে ঋণ দিত, তাদের সুদের হারও এখন ১ থেকে ২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।’

ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রী একটি নতুন ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ব্যবসাসংক্রান্ত নিয়মকানুন সহজীকরণ বা ‘ডি-রেগুলেশন’ কার্যক্রম তদারকি করতে সরকার একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।