‘হাসপাতালই এখন আমার ঘর, মেয়ে স্থায়ী বাসিন্দা’

দুই মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে ১৩ দিন ধরে হাসপাতালে আনোয়ারা বেগম। সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডে
ছবি: জুয়েল শীল

‘গত বছরের অক্টোবরে এক মাস হাসপাতালে ছিলাম মেয়েকে নিয়ে। তাঁর শ্বাসনালিতে সমস্যা। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এখন আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। মেয়েটা জন্মের পর থেকে হাসপাতালেই ঘুরেছে। দুই দিন পরপর কখনো জ্বর, কখনো কাশি নিয়ে চিকিৎসকের কাছে ছুটতে হয়েছে। তাই হাসপাতালই আমার ঘর। মেয়েটা স্থায়ী বাসিন্দা।’

আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দা নাসিমা আক্তার। আজ সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। নাসিমার মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (৮) তিন দিন আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। তাকে হাসপাতালের শিশু বিভাগের ৯ নম্বর শয্যায় রাখা হয়েছে। মেয়েকে নিয়ে বিপদের বিবরণ দেন নাসিমা। বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই রোগবালাই লেগে আছে সুমাইয়ার। গত বছর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। এরপর শ্বাসনালিতে সমস্যা ধরা পড়ে। ঢাকার হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু টাকার অভাবে যেতে পারিনি।’

নাসিমার তিন সন্তান। বড় ছেলে মোহাম্মদ আলম বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী (১৬)। ছোট ছেলে মো. শাহ আলমের বয়স ১৪ ছুঁই ছুঁই। বিকেলে যখন নাসিমার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তাঁর স্বামী জাহাঙ্গীর আলম পাশেই ছিলেন। তিনি পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। তিনি বলেন, ‘গাড়ি চললে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয়। এ টাকায় তিন সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ঘরভাড়াসহ সংসারের সব খরচ বহন করতে হয়। রোগবালাইয়ের পেছনেই টাকা সব চলে যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে ধার করতে হয়। এখন আবার মেয়ের ডেঙ্গু হলো। কীভাবে চলছি, সেটা আমরাই জানি।’

হাসপাতালে শুধু সুমাইয়া নয়, তার মতো আরও ২৫ শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। রাহাত্তারপুল থেকে পাঁচ বছর বয়সী সুবাহানা আক্তারকে নিয়ে গতকাল রোববার হাসপাতালে আসেন লিজা আক্তার। তিনি বলেন, দুই দিন আগে হঠাৎ জ্বর ওঠে সুবাহানার। শরীরটাও দুর্বল হয়ে যায়। পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এরপর অবস্থার আরও অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ১৩ দিন আগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে আসেন মা আনোয়ারা বেগম। তাঁর ছেলে ইয়াসির আরাফাতের বয়স মাত্র দুই মাস। হাসপাতালে আসার পর ছেলের জ্বর কমছিল না। রক্তের অণুচক্রিকা (প্লাটিলেট) একেবারে কমে গিয়েছিল। এ কারণে আট দিন তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখতে হয়। পরে অবস্থার উন্নতি হলে তাঁকে শিশু বিভাগে স্থানান্তর করেন চিকিৎসকেরা। আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘স্বামী মারা গেছে ছেলেটা পেটে থাকতে। এই ছেলেকে নিয়ে এখন যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আট দিন থাকতে হয়েছে আইসিইউতে। আর কত দিন হাসপাতালে থাকতে হবে জানা নেই।’

এদিকে ১১ মাস বয়সী ছেলে সাজিদুর রহমানকে নিয়ে ৬ আগস্ট হাসপাতালে আসেন নাসরিন আক্তার ও মোহাম্মদ সোয়াইব হোসেন দম্পতি। গতকাল চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু সাজিদুর গতকাল থেকে আবার ডায়রিয়া ও বমিতে আক্রান্ত হয়। নগরের চেরাগি পাহাড় মোড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ সোয়াইব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সাজিদুর তাঁদের একমাত্র ছেলে। এখন আবার দুশ্চিন্তা বেড়েছে।

ডেঙ্গু রোগ নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের ফিরিঙ্গী বাজার থেকে গতকাল আসে ত্রিপর্ণা দাশ। সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডে
ছবি:  জুয়েল শীল

আক্রান্ত ৯২, মৃত্যু ২

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ( রোরবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকার ৮টা) চট্টগ্রামে ৯২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। আর মারা গেছেন দুজন।

চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মারা যান নগরের মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সানজিদা আক্তার (৩৪)। একই দিন বেসরকারি সিএসসিআর হাসপাতালে মারা যান রাউজান ফকির টিলার বাসিন্দা ইদ্রিস মিয়া (৫৫)। এ ছাড়া ২৯ জুলাই মৃত্যুবরণ করা সিতারা জাহানের (৫৩) তথ্য আজ প্রকাশ করে সিভিল সার্জন কার্যালয়। সিতারা জাহানের বাড়ি রাউজানের গহিরা এলাকায়। তথ্যমতে, এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৪ হাজার ১৪৫ জন আক্রান্ত হন। আর মারা গেছেন ৩৬ জন। এর মধ্যে ১৫ শিশু।