গান, ছড়াপাঠ, অশ্রুভেজা স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে শিশুসাহিত্যিক, গীতিকার, সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক আখতার হুসেনকে স্মরণ করলেন খেলাঘর আসরের প্রবীণ–নবীনেরা। শুক্রবার ছুটির দিনের বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের খেলাঘর কার্যালয়ে আয়োজিত শোকসভায় তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কেউ কেউ।
খেলাঘর আয়োজিত শোকসভায় আলোচকদের কথায় উঠে এল—খেলাঘরের দলীয় সংগীতের গীতিকার, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালের অন্যতম সদস্য আখতার হুসেন প্রয়াত হয়েছেন, তবে তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর গানে, ছড়ায়। বেঁচে থাকবেন নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার জন্য তাঁর নিবেদিতপ্রাণ প্রচেষ্টায়। আখতার হুসেন গত ২৪ সেপ্টেম্বর ৮১ বছর বয়সে প্রয়াত হন।
আখতার হুসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শোকসভার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর খেলাঘরের সাথিরা মারুফ হোসেনের নেতৃত্বে পরিবেশন করে দুটি গান। প্রথমটি ছিল রবীন্দ্রসংগীত ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’। পরের গানটি আখতার হুসেনের লেখা, ‘আমরা তো সৈনিক শান্তির সৈনিক, অক্ষয় উজ্জ্বল সূর্য’। এই গান খেলাঘরের দলীয় সংগীত।
খেলাঘরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাজী মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে শোকসভা শুরু হয়েছিল কেন্দ্রীয় সম্পাদক ফারুক মহসীনের সঞ্চালনায়। আলোচকেরা সবাই দীর্ঘ দিন আখতার হুসেনের সঙ্গে খেলাঘরে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছেন। তাঁদের অনেক স্মৃতি রয়েছে তাঁকে নিয়ে। প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে শোকাভিভূত ছিলেন সবাই। স্মৃতিচারণা করতে এসে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি তাঁদের কেউ কেউ। বাষ্পরুদ্ধ হয়েছে কারও কারও কণ্ঠ।
আখতার হুসেনের সাহিত্য, তাঁর আদর্শ, সাংগঠনিক দক্ষতা থেকে ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছিল আলোচকদের কথামালায়। মাঝেমধে৵ ছিল তাঁর ছড়া পাঠ ও গানের পরিবেশনা। খেলাঘরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আখতার হুসেনের একটি অজানা দিকের কথা তুলে ধরেন। সেটি হলো গোপনে তিনি অনেক দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার জন্য আর্থিক সহায়তা দিতেন। বাংলা একাডেমির পুরস্কারের অর্থ তিনি নারায়ণগঞ্জের এক দরিদ্র পরিবারের কন্যাশিশুর পড়াশোনার জন্য ব্যয় করেছিলেন। নিজের সামর্থ্য না কুলালে কাছের মানুষদের কাছে হাত পাততেন দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়ালেখার খরচে সহায়তা করার জন্য।
খেলাঘরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাহমিনা সুলতান স্মৃতিচারণা করেন আখতার হুসেনের লেখা গানের। সংগঠনের সম্মেলনে, বিভিন্ন বিশেষ দিন উপলক্ষে তিনি নতুন নতুন গান বা ছাড়া লিখতেন। এসব গান ও ছড়ার মধ্য দিয়েই খেলাঘরের লক্ষ্য আদর্শ খুব সুন্দরভাবে প্রকাশিত হতো। তিনি আখতার হুসেনের এসব গান সংগ্রহ করে স্বরলিপিসহ সংরক্ষণ ও ব্যাপক প্রসারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও খেলাঘর সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আলী ইদ্রিস বলেন, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে খেলাঘর সংগঠনটি দেশের অন্যতম প্রধান একটি শিশু-কিশোর সংগঠনে পরিণত হয়েছিল, আখতার হুসেন ছিলেন তাঁদের অন্যতম। গীতিকার, ছড়াকার বা শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা আলোচনায় আসে। তবে শিশু সংগঠক হিসেবে যে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন, সেটি তেমনভাবে আলোচিত হয় না।
খেলাঘরের বর্তমান দ্বিধাবিভক্ত অবস্থায় আখতার হুসেন খুব কষ্ট পেয়েছেন জানিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল আজিজ বলেন, আখতার হুসেন ঐক্যের চেষ্টা করেছেন। শিশুদের জন্য নতুন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আবার তাঁর প্রিয় খেলাঘরকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার কথা ভাবতেন।
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়াত আলী বলেন, খেলাঘরের কর্মীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল আখতার হুসেনের। এমনকি অনেক সময় অনেক কর্মীর বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবরও নিয়েছেন।
আখতার হুসেনের অনেক গানের সুরকার সেলিম রেজা বলেন, আখতার হুসেনকে ভুলে থাকা যায় না। খেলাঘরের কর্মীরাই শুধু নয়, তাদের মা–বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও তিনি খুব সহজে মিশে গিয়ে একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতেন। এভাবেই তিনি বহু পরিবারের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ‘সেতু গড়ি চলো, সেতু গড়ি’ এবং ‘মেলা লেগেছে মেলা’ গান দুটির সুরারোপের স্মৃতিচারণা করে কিছু অংশ পরিবেশন করেন।
আলোচনায় আরও অংশ নেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবু সাঈদ, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল কবির, রথীন চক্রবর্তী, সদস্য প্রকৌশলী শ্যামল বিশ্বাস প্রমুখ। জীবনী পাঠ করেন তৌহিদ রিপন। ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে’ গানটি পরিবেশন করেন মারুফ হোসেন। ‘ভূগোলে যা নেই’ ছড়া পাঠ করেন শাহিন আক্তার।