স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন
ছবিতে যোগাযোগ, ড্রোনে নগর পরিকল্পনা—উদ্ভাবনের উৎসবে শিক্ষার্থীরা
টেবিলের ওপর সাজানো আম, কলা, আপেল, চকলেটসহ নানা কিছু। পাশে রাখা ছোট বোর্ডের মতো একটি বড় অ্যালবাম। সেখানে প্রতিটি জিনিসের আলাদা ছবি। সেখান থেকে কেউ একটি ছবি নিয়ে দিলে সেই ছবির সঙ্গে মিলিয়ে তাকে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট বস্তুটি। প্রথম দেখায় এটি হয়তো একটি খেলার আয়োজন মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যোগাযোগ সহজ করার একটি অভিনব ভাবনা।
এই ইনোভেশন আইডিয়ার (উদ্ভাবনী ধারণা) নাম ‘পিকচার এক্সচেঞ্জ কমিউনিকেশন (পিইসি) ’। রাজধানীর উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফিজা আমতুল্লাহ, আহনাফ আবদুল্লাহ ও সাফকাত সাঈদ আলাফ এটি প্রদর্শন করেছে। তাদের লক্ষ্য অটিজম, বাক্প্রতিবন্ধী ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সহজ ও কম খরচের যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করা।
আফিজা আমতুল্লাহ প্রথম আলোকে বলছিল, দেশে স্পিচ থেরাপির ব্যবস্থা থাকলেও তা ব্যয়বহুল। অথচ ছবিভিত্তিক তাদের এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ঘরেই একটি সহজ যোগাযোগ-সহায়ক ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। কোনো শিশু যদি কথা বলে নিজের প্রয়োজন জানাতে না পারে, তাহলে ছবির মাধ্যমে সে তার চাওয়া-পাওয়া প্রকাশ করতে পারবে।
আফিজার ভাষায়, ধরুন, একটি শিশু কোনো জিনিস চাইছে, কিন্তু বলতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে ছবির মাধ্যমে সেটি জানাতে পারবে। এতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যোগাযোগ শেখায় আকৃষ্টও হবে।
এমনই আরও অসংখ্য নতুন ভাবনা, বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আজ শুক্রবার সারা দেশের ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’-এ।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মিলনায়তনে রমনা শিক্ষা থানা এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবনী চিন্তা, বিজ্ঞান প্রকল্প ও স্টার্টআপ ধারণার প্রদর্শনী যেন পরিণত হয়েছিল তরুণ মেধার এক প্রাণবন্ত উৎসবে।
সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কেউ বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প নিয়ে এসেছে, কেউ পরিবেশ ও প্রযুক্তির সমাধান খুঁজছে, আবার কেউ কৃষিভিত্তিক উদ্যোগকে ব্যবসায়িক সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। যেমন সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শেখ সিফাত নিহাল জানায়, তাদের দল একটি কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ ধারণা নিয়ে কাজ করছে।
সকালে এখানকার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।
তবে শুধু রাজধানীতেই নয়, একই দিনে দেশের উপজেলা ও মহানগর শিক্ষা থানাগুলো মিলিয়ে ৫২০টি উপজেলা ও থানায় মেলার আদলে এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিরাও বিভিন্ন স্থানের আয়োজনে অংশ নেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের আওতায় প্রথমবারের মতো এই বৃহৎ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কর্মসূচি উপজেলা-থানা, জেলা ও জাতীয়-এই তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। আজ ছিল এর প্রথম ধাপ।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক দল অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ায় লক্ষাধিক দল নিবন্ধন করেছিল।
রমনা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মারুফ প্রথম আলোকে বলেন, রমনা থানার প্রদর্শনীতে ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪২টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়েরই ছিল ১০টি প্রকল্প। প্রতিটি দলে তিনজন শিক্ষার্থী ও দুজন শিক্ষক রয়েছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল পরবর্তী ধাপে অংশ নেবে।
মহানগর, জেলা–উপজেলায় উৎসব
সিলেট সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উদ্ভাবনসহ নানা প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প প্রদর্শন করা হয়। প্রদর্শনীতে অংশ নেয় সিলেট সদর উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পরিকল্পিত নগরায়ণে অবদান রাখতে একটি বিশেষ ড্রোন তৈরি করে প্রদর্শন করে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তাদের দাবি, ড্রোনটি আকাশ থেকে কোনো এলাকার তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে নগর-পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারবে।
সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিথ সামন্ত সরকার জানান, তাদের উদ্ভাবিত ড্রোনটিতে স্যাটেলাইট মডেম ব্যবহারের কারণে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটি আট কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে সক্ষম।
রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মো. আবদুস সিয়াম, মো. রমজান আলী ও তালহা জুবায়ের দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে ‘সেভ ড্রাইভিং সিস্টেম’এর ধারণা বের করেছে। রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে এটি প্রথম হয়েছে।
রাজশাহী মহানগরকে বোয়ালিয়া ও মতিহার এই দুই থানায় ভাগ করে অনুষ্ঠান হয়। মতিহার থানা থেকে ১৬টি ও বোয়ালিয়া থানা থেকে ১৩টি দল এই প্রতিযোগিতায় তাদের বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবনী প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়েছিল।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু সনদ বা ডিগ্রি প্রদানের জায়গা নয়, বরং দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র। তরুণ প্রজন্মের মেধা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাধারাই আগামী দিনের বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কুমিল্লা নগরের বজ্রপুর এলাকায় অবস্থিত ইউসুফ হাইস্কুলের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভিন্ন দৃশ্য। বিদ্যালয়ের মিলনায়তন ও পাশের কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ যেন পরিণত হয়েছে উদ্ভাবনের মেলায়। কোথাও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের নতুন কৌশল, কোথাও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা, আবার কোথাও কৃষির ডিজিটাল রূপান্তরের স্বপ্ন। সারি সারি স্টল ঘুরে মনে হয়, এটি শুধু একটি প্রদর্শনী নয়—এ যেন খুদে বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের মিলনমেলা।
সকালে বরিশাল জিলা স্কুলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান সরোয়ার। ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শন করে।
২৮ জুন ঢাকায় চূড়ান্ত পর্ব
প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী উপজেলা ও থানা পর্যায়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলগুলো পুরস্কৃত হবে। সেখান থেকে নির্বাচিত সেরা দলগুলো আগামীকাল ১৪ জুন জেলা পর্যায়ের প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। জেলা ও মহানগর পর্যায় থেকে বাছাই করা হবে সেরা ১০০টি দল। এরপর ২৮ জুন রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়া দলগুলো তাদের স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করবে। সেখান থেকে নির্বাচিত হবে সেরা ১০টি দল। বিজয়ী শিক্ষার্থীরা পাবে ২০ হাজার টাকা ও সনদপত্র। আর বিজয়ী শিক্ষকেরা পাবেন ৩০ হাজার টাকা ও সনদপত্র।
শুধু প্রতিযোগিতা বা পুরস্কার নয়, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য আরও বড়। শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর শিক্ষার গণ্ডি থেকে বের করে এনে তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা গড়ে তোলা।
একটি ছবি দিয়ে কথা বলার ব্যবস্থা, কৃষির নতুন সম্ভাবনা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের কোনো সমস্যার সহজ সমাধান-প্রদর্শনীতে উঠে আসা ধারণাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, সুযোগ পেলে দেশের শিশু-কিশোররাও ভাবতে পারে ভিন্নভাবে। তাদের কল্পনা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে নেই; সেই কল্পনা এখন বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজছে, অন্যরকম বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নও দেখছে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ও বরিশাল, প্রতিনিধি সিলেট, মাগুরা ও কুমিল্লা)