রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা: নাগরিক প্রতিবাদ’ শিরোনামের সভায় কথা বলেন দীঘলিয়ার সাহাপাড়ার বাসিন্দা হ্যামলেট সাহা। তাঁদের বাড়িতে আক্রমণের মধ্য দিয়েই ১৫ জুলাই ওই সাম্প্রদায়িক হামলা হয়।
ঘটনার বিবরণে হ্যামলেট সাহা বলেন, সেদিন যে ফেসবুক আইডি থেকে কটূক্তি করা হয়েছিল, সেটা আগের দিন রাত আটটার দিকে খোলা হয়। পরদিন বেলা দুইটার দিকে হঠাৎ বাজারে স্থানীয় লোকজন যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাজার ঘুরে মহড়া দিয়ে বেড়াছিলেন। তখন তাঁরা সবাই দোকানপাট বন্ধ করে দেন। তাঁর বাবা শিবনাথ সাহা ওই গ্রামের সভাপতি। আতঙ্কে সবাই তাঁদের বাড়িতে চলে আসেন। তখন তাঁর বাবা সবাইকে শান্ত থাকতে বলেন। তাঁরা নিজেরা যখন এভাবে কথা বলছিলেন, তার একপর্যায়ে ২০০ থেকে ৩০০ লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে চলে আসেন। তাঁরা তাঁর বাবাকে খুঁজতে থাকেন।

হ্যামলেট বলেন, ‘তখন আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তাঁরা বলেন, “মালাউনের বাচ্চারা, আমাদের দেশে থেকে আমাদের নবীর নামে এসব কথা বলছিস।” তখন আমি বললাম, এটা ফেইক আইডি থেকে হয়েছে। তখন পেছন থেকে ১৭–১৮ বছরের ছেলেরা বলে ওঠে, “মাতব্বর আর তাঁর ছেলেকে আগে পেটাই।”’ সেখানে তাঁর দু–তিনজন বন্ধু ছিলেন জানিয়ে হ্যামলেট বলেন, ‘তারা আমাদের নিরাপত্তা দেয়।’

তারপর হামলার শিকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় ফোন দেন বলে জানান হ্যামলেট সাহা। তিনি জানান, যাঁর বিরুদ্ধে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগ উঠেছে, সেই আকাশ সাহা পালিয়ে যাওয়ায় তাঁরা ভাবেন, অশোক সাহাকে পুলিশে দেবেন।

হ্যামলেট বলেন, ‘আমরা যখন অশোক সাহাকে পুলিশের কাছে দিলাম, যখন তাঁকে নিয়ে পুলিশ চলে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ৫০০–৬০০ জন, যাদের অনেককে চিনি, অনেককে চিনি না। এই পাড়ায় আমরা ১০৮ ঘর সাহা থাকি। তারা আমাদের পাড়ার ভেতরে প্রতিটি বাড়িতে ১০–১২ জন করে ঢুকে গেল। প্রতিটি বাড়ির দরজায় তারা কড়া নেড়ে বলেছে, “টাকা দে, না হলে ঘরবাড়ি ভেঙে দেব, পুড়িয়ে ফেলব, তোদের মেরে ফেলব।” যার কাছে টাকা ছিল, সে টাকা দিতে পেরেছে। তাদের ঘরবাড়ি ভাঙেনি। আর যে বাড়ির লোকজন আগে থেকে পালিয়ে গেছে, সেসব বাড়ি ভেঙেচুরে এবং একটি বাড়িতে তো আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।’

১৯৭১ সালের কাহিনি পত্রিকা ও টেলিভিশনে দেখেছেন, সেই ভয়াবহতা সেদিন রাতে টের পেয়েছেন উল্লেখ করে হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘শুভ বুদ্ধির লোক ওখানে অনেকেই ছিলেন। কিন্তু তাঁরা নিষ্ক্রীয় ছিলেন। আমার মনে হয়েছে, হামলা করেছে গুটিকয় লোক কিন্তু ওখানে অনেকেই ছিলেন নিষ্ক্রীয়। যার জন্যই এত বড় একটা ঘটনা ঘটতে পেরেছে।’

default-image

স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতারা যখন গ্রামে প্রবেশ করে তার আগেই হামলা শেষ। ভাঙচুর করেছে আসলে ৩০ মিনিটের মতো বলে জানান এই ভুক্তভোগী। হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘যখন বাজার লুট হয়, তখন এতজন ছিল যে তখন প্রশাসনের লোক ছিল ১০–১২ জন। বাজার লুট ঠেকানো যায়নি।’

‘আমরা আসলে আমাদের মা, বোন, কাকিদের নিরাপদ করার চেষ্টা করছিলাম যে সম্পদ যাচ্ছে যাক, সম্মানটা বাঁচুক,’ যোগ করেন হ্যামলেট সাহা।

খুব পরিচিত মানুষজন এই হামলা চালিয়েছেন জানিয়ে হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘আমার বড় ভাই এই গ্রামের অনেককে চাকরি দিয়েছেন। এই মানুষগুলোই হঠাৎ করে অপরিচিত হয়ে গেল। আমার মনে হচ্ছে, এই গ্রাম আমার না।’

হ্যামলেট সাহার বাবা শিবনাথ সাহা এলাকার সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি হিন্দু–মুসলিমনির্বিশেষে সবার সালিসে উপস্থিত থাকেন। হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘বাবাকে যখন গালি দিচ্ছিল “এই মালাউনের বাচ্চা”, তখন এই কষ্ট বাবা নিতে পারেননি। বাবা শুধু কাঁদছিলেন।’ তাঁরাও শুধু কেঁদেছেন।

হ্যামলেট সাহার বক্তব্যের এ পর্যায়ে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন করেন, পরিচিত ব্যক্তিরা বাড়িতে আক্রমণ করল, এখন তাদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?

জবাবে হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘আমাদের পাশে একটি গ্রাম আছে। আমরা যখন বিভিন্ন জায়গা থেকে শুনলাম আক্রমণ হতে পারে, তখন ওই গ্রামের নেতা ও লোকজন আমাদের পাহারা দেওয়ার জন্য চলে আসে। যার জন্য যত ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল, সেটা ওই গ্রামের মানুষের জন্য হয়নি। ওই গ্রামের সব লোক এখন আমাদের গ্রামের পাহারায় আছে।’

যাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সে প্রশ্ন করেছিলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। জবাবে হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘এটা আপনারা ভালো জানেন। এ নিয়ে আমি মন্তব্য করব না। কারণ, দিন শেষে আমি সংখ্যালঘু। আমাকে ঘরে ফিরতে হবে। আমি সব কথা বলতে পারব না।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন