গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিকে আরও সম্প্রসারিত করতে হবে

‘শিক্ষার্থী-শ্রমিক-জনতার “ দ্রোহযাত্রা”’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। পরে মিছিলটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। গতকাল বিকেলে রাজধানীর তোপখানা রোডেছবি: প্রথম আলো

হাল ছাড়া যাবে না। হতাশ হওয়া যাবে না। গণ-অভ্যুত্থানের শক্তির পেছনে দাঁড়িয়ে এই শক্তিকে আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ছাত্র, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, শ্রমজীবী, পেশাজীবী—সব শ্রেণি ও স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।

গতকাল রোববার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘দ্রোহযাত্রা’র দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে অর্থনীতিবিদ ও দ্রোহযাত্রার সভাপতি আনু মুহম্মদ এ আহ্বান জানান।

কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শিক্ষক, ছাত্র, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতিবাদী মিছিল ‘দ্রোহযাত্রা’ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। পরে শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে শেখ হাসিনার পতনের এক দফা দাবি তোলা হয়। এবার সেই দ্রোহযাত্রার দুই বছর পূর্তি হলো ছয় দফা দাবি নিয়ে।

এসব দাবির মধ্যে রয়েছে জুলাই হত্যার দ্রুত বিচার; মার্কিন বাণিজ্যচুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি বাতিল; জাতিগত, ধর্মীয়, লিঙ্গীয় নিপীড়ন বন্ধ করা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা; শ্রমিকের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা; উন্নয়নের নামে প্রকৃতিবিনাশী সব প্রকল্প বন্ধ করা; শিক্ষা এবং চিকিৎসা ও কাজের অধিকারকে জাতীয় নিরাপত্তার আওতাভুক্ত করা।

গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে আনু মুহম্মদের নেতৃত্বে দ্রোহযাত্রা শুরু হয়। মিছিলটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছালে বিকেল সাড় পাঁচটায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সমাবেশ। এরপর চব্বিশের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

আনু মুহম্মদ বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ও নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেলেও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণ–অভ্যুত্থানের পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার জনস্বার্থবিরোধী তৎপরতা শুরু হতে দেখা গেছে। এই দ্রোহযাত্রা সেদিন ছিল এক প্রবল আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ক্ষমতাহীন জনগণের ঐক্যের যাত্রা। সেই ঐক্য প্রমাণ করেছিল, ফ্যাসিবাদীরা যতই দাপট দেখাক না কেন, জনগণের সম্মিলিত শক্তির সামনের কেউ টিকে থাকতে পারে না।

কারফিউ উপেক্ষা করে জনগণের যে প্রবল শক্তি ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে, সেই শক্তিকে আবার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে উল্লেখ করে আনু মুহম্মদ বলেন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেসব চুক্তি হয়েছে, আগ্রাসনের যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, ভিন্নমত, আদর্শের বিরুদ্ধে আবার যে অসহিষ্ণুতা দেখা যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে এই দ্রোহযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে।

রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল ও কলেজের একাদশ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, তাঁর ছেলের মতো শিক্ষার্থীসহ যে দেড় হাজারের বেশি শহীদ তাঁদের জীবন উৎসর্গ করে এই অভ্যুত্থান সফল করেছেন, তাঁদের স্বপ্ন যেন বৃথা না যায়।

আরও বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামসেদ আনোয়ার, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফী রতন, গণতান্ত্রিক অধিকার কমটির সদস্য অধ্যাপক হারুন অর রশিদ, শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য অলিউর সান, বাসদ (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানাসহ অনেকে।

সমাবেশে বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে ছিল গান, আবৃত্তি ও নাটকের পরিবেশনা। ফারহানা ওয়াহিদ সায়ান পরিবেশন করেন চব্বিশের শহীদ নাফিসাকে নিয়ে লেখা তাঁর গান, আবৃত্তি করেন দীপক সুমন, একক কণ্ঠের সংগীতে ছিলেন অরূপ রাহী, কফিল আহমেদ। শেষে ছিল বিবর্তন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নাটক।