আকতার মাহমুদ বলেন, রাজধানীর গোড়ান চাটবাড়ির জলাধার, কল্যাণপুর জলাধার এবং বালু নদের পাশ ধরে আরও তিনটি জলাধার নিয়ে এই প্রস্তাব ছিল। এগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু রাজধানীর পানি নিষ্কাশিত হতো না, পাশাপাশি এগুলো হাতিরঝিলের মতো গণপরিসর হিসেবেও কাজ করত।

প্রবন্ধ উপস্থাপনে বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতার উদাহরণ দিয়ে আকতার মাহমুদ বলেন, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ১৯৯৫ সালে মহাপরিকল্পনা করা হয়েছিল। সম্ভাব্য খরচ ছিল ৩৫০ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ সালে এসেও পরিকল্পনাটির সামান্যতম বাস্তবায়ন হয়নি। যখন দেখা গেল শহরে গলাসমান পানি জমে জলাবদ্ধতা প্রকট হচ্ছে, তখন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলো। তাতে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ ভাগের ১ ভাগ বাস্তবায়নেই সম্ভাব্য খরচ দাঁড়াল ছয় হাজার কোটি টাকা।


জনঘনত্ব ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা জানিয়ে তিনি বলেন, জনঘনত্বের দিক থেকে বিখ্যাত শহরগুলোর মধ্যে নিউইয়র্ক, হংকং ও টোকিও অন্যতম। অথচ হংকংয়ে সর্বোচ্চ কোয়ানটং এলাকায় প্রতি একরে ২৩৩ জন বাস করে। নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে সর্বোচ্চ ১১২ জন আর টোকিওর তোসিমা এলাকায় ৯২ জন। বিপরীতে ঢাকার বংশালে প্রতি একরে বাস করে ৬৫১ জন মানুষ। এ ছাড়া পুরান ঢাকার চকবাজারে প্রতি একরে ৬২১ জন, লালবাগে ৬১৬ জন, কোতোয়ালিতে ৬০৪ জন এবং সূত্রাপুর এলাকায় ৫২০ জন। বাড্ডার মতো অপেক্ষাকৃত নতুন বসতির এলাকাতেও প্রতি একরে ৩৫০ জনের বেশি বসবাস করে। অথচ কোনো শহরের পরিকল্পনা করলে প্রতি একরে ১২০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ জনের পরিকল্পনা করা হয়। তা–ও যদি ওই এলাকায় পর্যাপ্ত উন্নত অবকাঠামো ও পরিবহন সক্ষমতার পাশাপাশি খোলা জায়গা নিশ্চিত করা যায়।

ঢাকায় পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে জানিয়ে আকতার মাহমুদ বলেন, মানুষ প্রতিনিয়ত কেন্দ্রমুখী অভিবাসিত হচ্ছে। এর কারণ, সবকিছুর কেন্দ্র ঢাকা। এতে যে পাহাড়সম চাহিদা তৈরি হয়, তার বিপরীতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠাগুলো সেবা দিতে হিমশিম খায়। দ্বিতীয়ত, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর নিজের জমি নেই। তাদের হয় অধিগ্রহণ করতে হয় অথবা জমি খুঁজতে হয়। আর তৃতীয়ত, ভূমির স্বল্পতা ও দুষ্প্রাপ্যতা। অবকাঠামোর জন্য উপযুক্ত জায়গা পাওয়া যায় না।

বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের বিষয় উল্লেখ করে আকতার মাহমুদ বলেন, বাস্তবায়িত না হওয়ার প্রধান কারণ অর্থের ধারাবাহিক প্রবাহ না থাকা। বাস্তবায়নে যে অর্থের প্রয়োজন, সেটা থাকে না। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও জনবলের সক্ষমতা এবং সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা কিংবা সমন্বয়ের অভাব।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। মেয়র বলেন, শহরের কোনো পরিকল্পনাই ছিল না, বাস্তবায়িত হবে কীভাবে? আর যা কিছু পরিকল্পনা ছিল, সেগুলোও বাস্তবায়নের নজির বেশি নেই।

মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটা বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো বিভিন্ন অংশে ভাগ করা হয়েছে। বিশেষভাবে ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা করে কাজ সাজানো হয়েছে। তবে এখন যে পরিমাণ মানুষ ঢাকায় আছে, এটা যথেষ্টর তুলনায় অনেক বেশি। এটা বৃদ্ধির চিন্তা মাথায় আনা যাবে না। বরং কমানোর চিন্তা করতে হবে। তাহলেই ঢাকা বাঁচানো যাবে। আগামী ৩০ বছর পর ঢাকাকে উন্নত ঢাকা হিসেবে গড়ে তোলা যাবে।

সংলাপে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিয়া বলেন, শুধু সড়ক নির্মাণ করে দেওয়া গেলেও রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান চাপ অনেক কমে যাবে। অন্যদিকে জনপরিসর ও রাস্তাঘাট প্রশস্ত করার জন্য পুরান ঢাকায় একটি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। যেখানে ছোট ছোট জায়গার মালিকদের একত্র করা হবে। তাঁদের সবার জমিতে একত্রে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে।

নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি অমিতোষ পালের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সোহেল মামুনের সঞ্চালনায় সংলাপে আলোচক হিসেবে ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ফারহানা শারমিন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ফজলে রেজা, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক নিলীমা আখতার, ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন