বাংলাদেশের মানুষের মনে সাম্যের যে আকাঙ্ক্ষা, তা প্রয়াত লেখক ও সমাজচিন্তক আহমদ ছফার মধ্যে ছিল। তিনি অনুধাবন করতেন, বাংলাদেশ একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে। মানুষ না খেয়ে থাকবে না। সব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়াবে। ধীরে ধীরে তার প্রতিফলন হচ্ছে। তাই আহমদ ছফা ছিলেন জনসাধারণের কবি।
রোববার বিকেলে রাজধানীর মিরপুরে সাধারণ কবরস্থানে আহমদ ছফার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এ কথাগুলো বলেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আহমদ ছফার কবরে নামফলক স্থাপন উপলক্ষে সেখানে যান সলিমুল্লাহ খান।
সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, আহমদ ছফা যে সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, সে সমাজ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি বলেন, ‘তিনি যা কল্পনা করেছিলেন, তিনি যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে আছে। সেই অর্থে জনসাধারণের কবি বলছি, অর্থাৎ জনসাধারণের মনের যে আকাঙ্ক্ষা, সাম্যের আকাঙ্ক্ষা, সেটা তাঁর মধ্যে আছে।’
আহমদ ছফা কবি–সাহিত্যিকদেরও কবি ছিলেন। এখন তিনি সর্বসাধারণের কবি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘শুধু কবি নন, তিনি কথাশিল্পী। তিনি চিন্তাবিদ। যাদের আমাদের দেশে এক শব্দে বুদ্ধিজীবী বলে।’
বিগত সময়ে বিভিন্ন সরকার আহমদ ছফাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি উল্লেখ করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, দেশের মানুষ তাঁকে সম্মান জানাচ্ছে বলেই আজকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন তাঁর এই স্মৃতিফলকে আরেকটা ফলক স্থাপন করেছে, তাঁরই কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে। এটা তাঁর প্রতি একধরনের স্বীকৃতি। তবে মৃত্যুর পর আহমদ ছফাকে যে একুশে পদক দেওয়া হয়েছিল, সেটাও মনে রাখার মতো বলে উল্লেখ করেন সলিমুল্লাহ খান।
সম্প্রতি আহমদ ছফার কবরের নামফলক নতুন করে স্থাপন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। আগের নামফলকের লেখা মুছে যাওয়ায় প্রয়াত এই লেখকের পরিবার ও সমর্থকদের অনুরোধ এ উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ।
রোববার আহমদ ছফার কবরে গিয়ে দেখা যায়, কবরের এক পাশে তাঁরই লেখা একটি গানের অংশ বসানো হয়েছে—
‘আমার কথা কইবে পাখি করুণ করুণ ভাষে
আমার দুঃখ রইবে লেখা শিশির ভেজা ঘাসে
আমার গান গাইবে দুখে পথ হারানো হাওয়া
আমার নাম বলবে মুখে মেঘের আসা যাওয়া
ইন্দ্রধনু লিখবে লিখন কেমন ভালোবাসে
দীঘল নদী করবে রোদন সমাধিটির পাশে।’
কবরের অন্য পাশে রয়েছে আহমদ ছফার ‘কবি ও সম্রাট’ কবিতায় মীর ত্বকী মীরের নামে তিনি যে আত্মপরিচয় লিখেছিলেন, সেই অংশ—‘আমি তো দেহাতি লোক সর্বক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি। এমন তৌফিক নেই অক্ষমতা চাকি। বুলিতে মাটির গন্ধ, লেবাসে মিসকিন, ভাঙাচোরা মানুষের সঙ্গে কাটে দিন।’
এ ছাড়া কবরটিতে আহমদ ছফার পারিবারিক তথ্য ও তাঁর অবদানের তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে।
আহমদ ছফার কবরে নামফলক স্থাপন উপলক্ষে রোববার বিকেলে সেখানে যান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ ইজাজ। তিনি জানান, উত্তর সিটি করপোরেশন দ্রুততম সময়ে আহমদ ছফার কবরটিকে পার্শ্ববর্তী শহীদ বুদ্ধীজীবী কবরস্থানে সরিয়ে নেবে। আগামী এক মাসের মধ্যেই তাঁরা এটি করবেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজেকা ফেরদৌস, আহমদ ছফার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আব্দুল হক, আহমদ ছফার পালক পুত্র সুশীল সিংহ, ‘আহমদ ছফা রচনাবলি’র সম্পাদক নূরুল আনোয়ার প্রমুখ। পরে তাঁরা আহমদ ছফার কবর জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কবরের পাশে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হন।
নূরুল আনোয়ার সম্পর্কে আহমদ ছফার ভাইয়ের ছেলে। তিনি অভিযোগ করেন, মৃত্যুর পরে আহমদ ছফাকে তাঁর পরিবার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের বাধায় সেটা হয়নি। তিনি বলেন, দেশের মানুষ ও সরকারের উচিত, আহমদ ছফাকে নতুন করে সম্মান দেখানো।