অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ১৫ শতাংশ: বিআইজিডি
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিদ্যালয়ে হতদরিদ্র প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। আর প্রতিবন্ধী শিশুদের বুলিং বা হয়রানির শিকার হওয়ার হার আগের চেয়ে কমেছে ৮ শতাংশ।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘নগদ অর্থ সহায়তার বাইরে: অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও জীবিকা উন্নয়ন কর্মসূচির নতুন প্রমাণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ তথ্য প্রকাশ করেছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)।
প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সাইটসেভার্স বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। যেই কর্মসূচির নাম ‘শিখবো সবাই’।
শিখবো সবাই কর্মসূচির ওপর বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অনুষদ যৌথভাবে একটি গবেষণা করে। কর্মসূচির আওতায় ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকা ১২২টি বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬১৫ জন প্রতিবন্ধী শিশুর ওপর চালানো এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে বিআইজিডি।
ইতিবাচক প্রভাব বেশি
‘ইফেক্টিভনেস অব আ হলিস্টিক এডুকেশনাল ইন্টারভেনশন ফর চিলড্রেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ: এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশ (ইভালুয়েশন অব শিখবো সবাই প্রজেক্ট)’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র দাস।
নারায়ণ চন্দ্র দাস জানান, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সার্বিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, বাড়িতে শিশুদের বাড়তি যত্ন নেওয়া এবং সামাজিক সহায়তা বাড়ানো গেলে তাদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়, যা প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
শিখবো সবাই প্রকল্পের মূল্যায়ন উপস্থাপন করে নারায়ণ চন্দ্র দাস বলেন, প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রতিবন্ধী ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব বেশি দেখা গেছে। এ ছাড়া গবেষণায় উঠে এসেছে, ছাত্রীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হার এবং বাড়িতে পড়াশোনার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নারায়ণ চন্দ্র দাস আরও বলেন, এটি শিশুদের প্রয়োজনীয় সহায়ক যন্ত্রপাতি ও ফিজিওথেরাপি সহায়তার ফলাফল। বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের বুলিং বা হয়রানির শিকার হওয়ার হারও আগের চেয়ে ৮ শতাংশ কমেছে।
গবেষণার সুপারিশে ছেলেশিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ছেলেমেয়ে উভয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা সহায়তা আরও জোরদার করার কথা বলা হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, শিখবো সবাই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের বাড়িতে গিয়ে পড়াশোনায় সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁরা। এ ছাড়া অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ, পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত করার কাজও করেন তাঁরা। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় সমাজে প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।
বিআইজিডির জেন্ডার অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ক্লাস্টারের প্রধান শায়লা আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে শিখবো সবাই প্রকল্পের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন সাইটসেভার্সের এডুকেশন প্রজেক্ট ম্যানেজার আওয়ানা মারজিয়া।
প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আওয়ানা মারজিয়া বলেন, তাঁরা মাঠপর্যায়ে দেখেছেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ—এই তিনটি পর্যায়ে একসঙ্গে সহায়তা দিলে তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে। পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের শেখার সুযোগও বাড়ে।
শিখবো সবাই প্রকল্পের মূল্যায়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, শুধু স্কুলে ভর্তি বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ালেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হবে না, পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ কীভাবে নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে সামগ্রিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি।
অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, দাতা সংস্থার অর্থায়ন শেষে সরকারি পর্যায়ে এই মডেলের স্থায়িত্ব ও শিক্ষণ পদ্ধতি কেমন হবে? গবেষণার ফলাফলে সেটার সুস্পষ্ট সুপারিশ উল্লেখ করার কথা বলেন তিনি। প্রতিবন্ধী শিশুদের পাঠদানে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং নীতি নির্ধারণে প্রতিবন্ধী শিশুদের নিজস্ব মতামতকে যুক্ত করার কথাও বলেন এই অধ্যাপক।
ব্র্যাকের কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধীদের পরিবারের আয় বেড়েছে ২০ শতাংশ
অনুষ্ঠানে আলাদা অধিবেশনে বাংলাদেশে হতদরিদ্র প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে পরিচালিত ব্র্যাকের ‘ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ আল্ট্রা–পুওর গ্র্যাজুয়েশন (ডিআইইউপিজি)’ কর্মসূচি নিয়ে আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল উপস্থাপন করেন বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী মহিমা গোমেজ ও তাহাসিন তাসনিম মোহছে।
‘ক্যান ডিজঅ্যাবিলিটি–ইনক্লুসিভ পোভার্টি গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রাম রিডিউস পোভার্টি অ্যামং পারসোনা উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি?’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফলে উপস্থাপকেরা দেখান, ডিআইইউপিজি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর মাসিক আয় গড়ে ২০ শতাংশ বেড়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মাসিক খাদ্য ব্যয় ৭ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় বেড়েছে ২০ শতাংশ। আর উৎপাদনশীল সম্পদের মূল্য বেড়েছে ২৫৬ শতাংশ। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান বেড়েছে ২১ শতাংশ।
উপস্থাপকেরা বলেন, কর্মসূচির আওতায় ব্র্যাক হতদরিদ্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে শুধু সম্পদ দেয়নি; বরং সম্পদের দেখভাল ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় সার্বিক সহায়তায়ও যুক্ত ছিল।
কর্মসূচির আওতায় থাকা পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে উল্লেখ করে উপস্থাপকেরা বলেন, চাষাবাদের মাধ্যমে পরিবারগুলো নিজস্ব খরচ মিটিয়ে আবার সেটার বিনিয়োগও করতে পারছেন। পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হতে পারছেন। এটা পরিবারগুলোর আশা ও আত্মবিশ্বাস আগের চেয়ে বাড়িয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় উপকৃত হয়েছে, এমন বেশ কয়েকটি পরিবারের উদাহরণ উপস্থাপন করে ডিআইইউপিজি কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি) মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, ব্র্যাক পরিবারগুলোকে প্রশিক্ষণ, সম্পদ, আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা দিয়ে টেকসইভাবে দারিদ্র্য থেকে স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা করেছে। এটা তাদের দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করেছে।
গবেষণা মূল্যায়ন করে বিআইজিডির অধ্যাপক ও গবেষণা পরিচালক মুনসি সুলাইমান বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাবলম্বী করতে মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুৎপাদনশীল ভাবার মানসিকতা এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। তাই শুধু নগদ অর্থ বা ভাতা দিয়ে নয়; বরং তাঁদর কর্মসংস্থানের সুযোগ দিলে তাঁরা নিজেরাই আয় করতে পারেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ ও নীতিনির্ধারণের সমন্বয় নিয়ে একটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশন পরিচালনা করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক এস এম জুলফিকার আলী। তিনি প্রতিবন্ধিতাকে কেবল এক ক্যাটাগরিতে না দেখে এর ধরন (মৃদু, মাঝারি ও গুরুতর) অনুযায়ী আলাদা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।
জুলফিকার আলী প্রতিবন্ধী শিক্ষা ও ‘আলট্রাপুওর গ্র্যাজুয়েশন’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতাকে সরকারি নীতিমালায় যুক্ত করার আহ্বান জানান।
এই অধিবেশনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা) মোহাম্মদ নাজমুল আহসান বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আত্মোন্নয়নে সরকার নতুন নতুন কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় তৃণমূল পর্যায়ে থেরাপি ও প্রয়োজনীয় সহায়ক ডিভাইস পৌঁছে দিচ্ছে উল্লেখ করে নাজমুল আহসান বলেন, এর পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারেরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাসের (বি-স্ক্যান) প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব সালমা মাহবুব প্রতিবন্ধী শিশুদের সাধারণ স্কুল থেকে আলাদা না করে মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, বিশেষায়িত স্কুলগুলো মূলত শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকায় এসব স্কুলে প্রয়োজনীয় শিক্ষকের (ব্রেইল ও সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ) তীব্র সংকট রয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল সময়ের দাবি
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য ও উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মাতিন। তিনি বলেন, দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধিতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দরিদ্র পরিবারে প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি বেশি, আবার প্রতিবন্ধী থাকলে সেই পরিবারের পক্ষে দারিদ্র্য জয় করাও কঠিন। তাই শুধু ভাতা বা উপবৃত্তি দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টিতে একটি সামগ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল তৈরি এখন সময়ের দাবি।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজে পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ এবং টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ তৈরির কথা বলেন ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনের সামাজিক উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা তাহেরা জাবীন।
গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে কীভাবে বৃহত্তর পরিসরে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি ও কর্মসূচিতে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় সেটা ভেবে দেখার কথা বলেন—লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের (এলএসএইচটিএম) ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এভিডেন্স ইন ডিজঅ্যাবিলিটির সহকারী অধ্যাপক মার্ক ক্যারিউ।
অনুষ্ঠান শেষে ধন্যবাদ জানান লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের (এলএসএইচটিএম) ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এভিডেন্স ইন ডিজঅ্যাবিলিটির (আইসিইডি) সহযোগী অধ্যাপক (প্রতিবন্ধিতা গবেষণা) মরগান ব্যাংকস।