সাক্ষাৎকার

সমন্বিত চেষ্টায় কমবে স্বাস্থ্যঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিসহ স্বাস্থ্য খাতের নানা বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তুরানুর ইসলাম

প্রথম আলো:

২০২৬ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্য-মাত্রা অর্জনে আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাকে কতটা কাজে লাগাতে পারছি? 

মোস্তফা আজিজ: গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের লজিস্টিক সাপোর্ট বা অবকাঠামো যে একদম নেই, তা নয়। তবে চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা অনেক কম। বড় সমস্যা হলো আমাদের একাডেমিক কারিকুলাম ও চিকিৎসকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণাকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যদি এমন নিয়ম থাকত যে ইনডেক্সড জার্নালে গবেষণা প্রকাশ ছাড়া পদোন্নতি হবে না, তবে চিকিৎসকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গবেষণায় যোগ দিতেন। গবেষণামুখী না হলে বিজ্ঞানের সুফল পাওয়া কঠিন।

প্রথম আলো:

নিপাহ বা বার্ড ফ্লুর মতো ভাইরাসগুলো প্রতিনিয়ত রূপ পাল্টাচ্ছে। আমাদের সচেতনতার অভাব কি এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে?

মোস্তফা আজিজ: সংক্রামক ভাইরাসগুলো মিউটেশনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত রূপ পরিবর্তন করে, যা আগে থেকে ধারণা করা প্রায় অসম্ভব। তবে শঙ্কার বিষয় হলো আমাদের পরিবেশদূষণ ও অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (ইমিউনিটি) ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে যেকোনো নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ বা মহামারিতে বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

প্রথম আলো:

জলবায়ু পরিবর্তন কি ক্যানসারের ওপর কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে?

মোস্তফা আজিজ: অবশ্যই। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে, ফলে মিঠাপানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো বহুমাত্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের ফলে অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি আসছে, যা স্কিন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশের ক্ষতি নয়,  সরাসরি ক্যানসারসহ নানা প্রাণঘাতী রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রথম আলো:

ব্রয়লার মুরগি বা গবাদিপশুতে অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েডের যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের কতটা ক্ষতি করছে?

মোস্তফা আজিজ: এটি অত্যন্ত মারাত্মক এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগিতে ইস্ট্রোজেন ইনজেকশন দেওয়ার কারণে আমাদের এই উপমহাদেশের অল্পবয়সী মেয়েদের মধ্যে ‘আর্লি ব্রেস্ট ক্যানসার’ বা অকাল স্তন ক্যানসারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ ছাড়া খাদ্যে ভেজাল ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সরাসরি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

প্রথম আলো:

এই দূষণ ও ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আমরা কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারি?

মোস্তফা আজিজ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, আমরা যদি এখনই দূষণ, খাদ্যে ভেজাল ও স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ক্যানসারের একটি ‘সুনামি’ দেখা দেবে। এটি কোনো কাল্পনিক শঙ্কা নয়; বরং বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহ ইঙ্গিত।