ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্র সভ্য হয় না

‌‘অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। সিরডাপ মিলনায়তন, ঢাকা; ৮ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: সিজিএসের সৌজন্যে

ঝুঁকিপূর্ণ ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্রকে সভ্য বলা যায় না। অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে নয়; বরং নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক আচরণ, নীতি বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক নীতি সংলাপে এ কথাগুলো উঠে আসে। ‌‘অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।

আলোচনায় রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন। জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক বক্তব্যে অন্তর্ভুক্তি, সংখ্যালঘু অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন কতটা, তা আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেন, একটি গণতন্ত্রের গুণগত মান নির্ধারিত হয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিজেদের কতটা নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্ত মনে করে, তার ওপর। সংখ্যালঘু পরিচয় বাইরের কেউ চাপিয়ে দেবে, নাকি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী নিজেরাই যেভাবে নিজেদের পরিচয় দিতে চায়— এটাই মূল বিষয়। কেউ নিজেকে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত করতে না চাইলে সেই পরিচয় আরোপ করা যায় না।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এই ডিস্টিংগুইশড ফেলো আরও বলেন, নারীরা এ ক্ষেত্রে একটি জটিল বাস্তবতার উদাহরণ। সংখ্যাগতভাবে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনী ক্ষমতার প্রশ্নে প্রায়ই সংখ্যালঘু অবস্থানে পড়েন।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে রওনক জাহান বলেন, সচেতন নীতিনির্ধারণ ও ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমেই অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। নির্বাচনের সময় ভোটাধিকার প্রয়োগ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যে যেন মানুষকে কোনো একটি বেছে নিতে না হয়, সে দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হলে তা নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্রকে সভ্য বলা যায় না। ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভয়মুক্ত ভোট প্রদান এবং স্বচ্ছ ভোটপ্রক্রিয়াই অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচনী ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত না হলেও এটি জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর একধরনের চুক্তি উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইশতেহারের অঙ্গীকারগুলো হতে হবে বাস্তবায়নযোগ্য। নির্বাচন অবশ্যই আইনানুগ, অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে। কারসাজিমুক্ত নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

কী বলছে দলগুলো

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই সনদ সময়োপযোগী ও বাস্তবধর্মী সংস্কারের একটি ইঙ্গিত দেয়। সংখ্যাগত অবস্থান যা-ই হোক, সবাই এই দেশের নাগরিক—কাউকে সীমিত পরিচয়ে আবদ্ধ করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। তিনি জানান, জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাসহ তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং অযৌক্তিক প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে চলা হয়েছে।

বিএনপি নেতা ও আইনজীবী শাহাব উদ্দিন খান ‘অর্থনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু’ নামে সংখ্যালঘু যুক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, পোশাক-আশাকে তিনি যে সুবিধা পান, প্রান্তিক এলাকার গরিব মানুষ যিনি, তিনি তো একই সুবিধা পান না। শাহাব উদ্দিন উল্লেখ করেন, নির্বাচনে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল প্রার্থী যাঁরা, তাঁদের মনোনয়নসহ সবকিছুতে অনেকটা পিছিয়ে থাকতে হয়।

গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার অঙ্গীকার বারবার করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি; বরং মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছে। জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বৈষম্যের মুখে পড়ছে। বৈষম্য বিলোপ আইন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিরাপত্তা আইন ও সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানান তিনি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, ১৯৭১ সালের পর যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পরও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সবার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে; কারণ, সবাই এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়।

সুস্পষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা জরুরি

সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও তাদের অধিকার বাস্তবায়নে কী করা হবে, তা ইশতেহারে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা জরুরি বলে মত দেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশনা ইমাম।

আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান হলেও ধনী-গরিবের পার্থক্য এবং সংবিধানের সমতার প্রতিফলন না থাকায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিজেরা ভালো আছে এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে—এ কথা বলতে পারলেই বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে উন্নত বলা যাবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার—এই তিনটি বিষয় পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে এখনই সুস্পষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলে বারী মাসুদ, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, শ্রমিক অধিকারকর্মী তাসলিমা আকতার, এনডিএমের মহাসচিব মোমিনুল আমিন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য সাঈদ ফেরদৌস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা, ট্রান্স ফেমিনিস্ট ও জেন্ডার অ্যাকটিভিস্ট হো চি মিন ইসলাম প্রমুখ।