মো. আসাদুজ্জামান (আতিফ আসাদ নামেও পরিচিত) জামালপুরের সরিষাবাড়ীর ছেলে। রোববার বিকেলে মুঠোফোনে কথা হলো তাঁর সঙ্গে। পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ তখনো তাঁর কণ্ঠে। সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া আসাদুজ্জামান জানালেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে নিজের বাড়ির বারান্দায় মিলন স্মৃতি পাঠাগারের যাত্রা শুরু করেন। আর এতে এলাকার বড় বোন শর্মি আক্তার নিজের পুরোনো প্রায় ২০টি বই দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। এখন আসাদুজ্জামানের তদারকিতে পরিচালিত ১৬টি পাঠাগারে মোট বইয়ের সংখ্যা ৮ হাজার।

এই বইপ্রেমীর পাঠাগারের মধ্যে রয়েছে স্টেশন পাঠাগার, শিশু পাঠাগার (একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শেলফে শিশুদের জন্য বই রাখা। ওই স্কুলের শিশুরা সপ্তাহে একদিন বই নিতে পারে), পথ পাঠাগার (পথের পাশে শেলফে বই রাখা), গণপাঠাগার ( পাঁচজনের বাড়িতে একটি করে শেলফে বই রাখা। সেখান থেকে আশপাশের লোকজন নিয়ে বই পড়ে ফেরত দিয়ে যাবেন)।

আসাদুজ্জামান জানালেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সহায়তায় তিনি পাঠাগারের জন্য বই, শেলফ পাচ্ছেন। পাঠকেরা একটি ফরম পূরণ করে রেজিস্টার খাতায় নাম লিখে বাড়িতে বই নিয়ে যান এবং পড়া শেষে বই ফেরত দিয়ে যান।

পাঠাগারগুলো কীভাবে পরিচালিত হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বললেন, ‘আমার বারান্দা আর ঘরের মধ্যে শেলফে বই রাখা। একইভাবে রেলস্টেশনের কোনো দোকানে শেলফে বই রেখে পাঠাগার বানানো হয়েছে। স্টেশন পাঠাগারে সেখানে বই পড়েই আবার জমা দেন যাত্রীরা। অন্য পাঠাগারে বসে বই পড়ার সুযোগ নেই। বই দেওয়া–নেওয়ার কাজ করেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। আর আমি বাড়িতে না থাকলে বাবা, মা, ভাবি, চাচাতো ভাইবোনেরা এ কাজ করেন।’

পাঠাগার তৈরির চিন্তা কেমন করে মাথায় এল সে বিষয়ে বলেন,  প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় প্রতি বৃহস্পতিবার স্কুল থেকে গল্পের বই পড়তে দিত। তিনজনের একটি বেঞ্চে একটি করে বই দিত। সেখানে বইটি পড়ে শেষ করতে পারতেন না। মনে হতো বাড়ি এনে পড়তে পারলে ভালো লাগত। সে থেকেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মে। এরপর ষষ্ঠ শ্রেণিতে বয়ড়া ইসরাইল আহম্মেদ উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় ব্র্যাকের পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়তেন। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন হরখালী মুজিবর রহমান আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর এক স্মরণীয় ঘটনা রয়েছে। আসাদুজ্জামান বলেন, ‘প্রত্যন্ত গ্রামে স্কুল হওয়ায় বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন একবারেই কম। পাঠাগার ছিল না, হেডস্যারের রুমে একটা তালাবন্ধ শেলফ ছিল। সেখানে অনেক গল্প–উপন্যাসের বই ছিল। কিন্তু কখনো কাউকে সেখান থেকে বই পড়তে দিত না। একদিন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সেই এলাকায় আসবেন বলে আমাদের নবম শ্রেণির ছেলেদের দায়িত্ব দিল একাডেমিক বইগুলো একটু সরাতে হবে। সেই সুযোগে আমরা শেলফ থেকে বই চুরি করে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিই। ছুটির পর সেগুলো নিয়ে যাই। এরপর অবশ্য এ জন্য শাস্তি পেতে হয়েছিল। এভাবেই বইয়ের প্রতি প্রবল ভালোবাসা জন্মে।’

জীবনসংগ্রাম

আসাদুজ্জামান জানালেন, অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষার পর রং বার্নিশের আর এসএসসি পরীক্ষার পর রাজমিস্ত্রির সহায়তাকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। কয়েক মাস পরপর দিনাজপুর, ভালুকাসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এ কাজ করেন, যাতে পড়াশোনার ক্ষতি না হয়। দিনে মজুরি পান ৩৫০ টাকা। এ টাকায় পড়াশোনার খচর চলে না। পরিবারের কাছ থেকেও কিছু টাকা নিতে হয়। তাতেও না হলে এলাকার অনেকেই আর্থিক সহযোগিতা করেন।

আসাদুজ্জামান সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। চার বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ২০১৮ সালে বড় ভাই রবিউল ইসলাম মিলন খুন হন। বড় ভাইয়ের স্মৃতি ধরে রাখতেই আসাদুজ্জামান তাঁর পাঠাগারের নাম দেন মিলন স্মৃতি পাঠাগার। মেজ ভাই রড–সিমেন্টের দোকানের কর্মচারী, তিনিই এখন সংসার চালান।

পাঠককে বই পড়ায় আগ্রহী করতে...

ঘরের বারান্দায় পাটশোলার বেড়া দিয়ে পাঠাগার শুরু করেছিলেন আসাদুজ্জামান। ঘরের কিছু কাঠ ছিল, তা দিয়েই নড়বড়ে একটা বই রাখার শেলফ বানিয়েছিলেন। এরপর কেউ কেউ বইয়ের পাশাপাশি স্টিলের আলমারিও বানিয়ে দিয়েছেন। দেশে ও বিদেশে থাকা ব্যবসায়ী, সমাজ উন্নয়নকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, নারী ক্রিকেটার—এভাবে অনেকেই আসাদুজ্জামানের পাঠাগার গড়ায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কেউ শেলফ কিনে দিচ্ছেন, কেউ আসাদুজ্জামানের জন্য নতুন সাইকেল কিনে দিয়েছেন। আর আসাদুজ্জামান বই পড়তে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন। আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী, কে এইচ মালেক, ঝন্টু সরকার, সিলভিয়া পন্ডিত, জান্নাতুল ফেরদৌস, নিশাত সুলতানা, সামিনা নাজ, এমদাদুল হক, আরিফা জাহান, রামিসা চৌধুরী, ইয়াসিন শিমুল—এভাবে নামের তালিকা বড় হচ্ছে।

বই পড়তে পাঠককে উৎসাহিত করতে শুরুর দিকে আসাদুজ্জামান সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই দিয়ে আসতেন। এখন বিভিন্ন গ্রামে পাঠাগার হয়েছে। পাঠাগারের পাঠক ধরে রাখতে আসাদুজ্জামান পাঠকদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন আয়োজন করেন। বেশি বই পড়া পাঠকের জন্য সনদেরও ব্যবস্থা আছে।

আসাদুজ্জামান বললেন, ‘অনেকেই বলতে চান ছেলেমেয়েরা বই পড়ে না। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। আসলে হাতের কাছে সুযোগ না থাকায় তারা বই পড়ে না। এলাকায় মাদকের মতো বিভিন্ন অপরাধ একেবারে কমে গেছে, তা বলা যাবে না। তবে যে ছেলেমেয়েরা বই পড়ে সময় কাটায়, তারা এসব অপরাধ থেকে দূরে থাকতে পারছে।’

আসাদুজ্জামান হাসতে হাসতে বললেন, ‘বই ঠিক সময়ে ফেরত না দিলে এখন পর্যন্ত পাঠককে কোনো জরিমানা দিতে হচ্ছে না, শুধু সতর্ক করা হচ্ছে। এটাও পাঠকের জন্য বড় সুযোগ।’

তবে পাঠাগারের বই নিয়ে কিছু নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও হয় আসাদুজ্জামানের। প্রথম আলোর সরিষাবাড়ী প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম সোমবার সরিষাবাড়ী উপজেলার আওনা ইউনিয়নের দৌলতপুরে মতিয়ার রহমান রেলওয়ে স্টেশনে ইস্টিশন পাঠাগারে গিয়ে দেখতে পান, সেখানে বই রাখার তাক থাকলেও তা খালি, বই নেই। সরিষাবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনের পাঠাগারেরও একই অবস্থা। তবে পোগলদিঘা ইউনিয়নের তারাকান্দি রেলওয়ে স্টেশনের পাঠাগারে বই রাখার আলমারিতে প্রায় ৩০০ বই পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, স্টেশনের পাঠাগারে বই দেওয়া হলেও তা ট্রেনের যাত্রীরা পড়ে ট্রেন আসার সময় তা নিয়ে চলে যান। পাঠাগার দেখাশোনার লোক না থাকায় দুটি পাঠাগারে বই রাখা সম্ভব হচ্ছে না। লোক পেলেই আবার পাঠাগারে বই রাখা হবে।  

আসাদুজ্জামান ফেসবুকে তাঁর নিজের পরিচয় দিয়েছেন বইয়ের ফেরিওয়ালা হিসেবে। তিনি স্বপ্ন দেখেন প্রতিটি গ্রামে ও দেশের রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে পাঠাগার থাকবে। পাঠাগারগুলোতে একদিন বসার জায়গাও হবে। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পাঠচক্র হবে। এসবের পাশাপাশি নিজস্ব জমিতে একটি পাঠাগার ভবন করার স্বপ্নও আছে তাঁর।