নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট সাড়ে ছয় টাকা ধরার প্রস্তাব
নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা হারে দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা, কর্মী ও প্রশাসনিক ব্যয়, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, অবচয় ও বিনিয়োগের ওপর রিটার্ন—এসব খরচ যুক্ত করা হয়েছে।
আজ রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এই প্রস্তাব করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।
মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। প্রস্তাবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি বিদ্যুতের মিটার, এএমআর (স্বয়ংক্রিয় মিটার রিডিং), মিটার পরীক্ষা ও সিলিং, বিলিং ও সংগ্রহ, বিতরণব্যবস্থার ক্ষতি এবং এনার্জি ম্যানেজমেন্টের খরচও বিবেচনায় নিয়েছে। প্রস্তাবে বছরে প্রায় ৯১ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপরীতে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৯৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি মো. দিদারুল আলম বলেন, ৫০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের হিসাব করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রের সক্ষমতার ১০ থেকে ২০ শতাংশ ব্যাটারি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
৬ টাকা ৪৮ পয়সা নিয়ে প্রশ্ন
গণশুনানিতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, ভারতের তুলনায় এই দাম অনেক বেশি। পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের প্রস্তাবিত দাম তুলনা করে তিনি এটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।
এম শামসুল আলমের প্রশ্নের উত্তরে গণশুনানিতে বিইআরসির কর্মকর্তারা বলেন, নির্দিষ্ট কিছু প্যারামিটার ও ব্যয়ের হিসাবের ভিত্তিতে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব প্যারামিটার পরিবর্তন হলে দাম পরিবর্তন হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন কর্মকর্তারা।
তবে প্রস্তাবিত ৬ টাকা ৪৮ পয়সা ন্যায্য ও যৌক্তিক—এটি বিইআরসিকে তথ্য–উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন এম শামসুল আলম।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের জন্য বেঞ্চমার্ক দাম (সর্বোচ্চ মূল্য) নির্ধারণের ওপর জোর দিয়ে এম শামসুল আলম বলেন, আইপিপি, পিপিপি বা এসআইপিপির বিদ্যুতের দাম এখনো যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। অতীতে উচ্চমূল্যে যেভাবে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে, সেটিকে তিনি ‘লুণ্ঠনমূলক’ বলে মন্তব্য করেন।
এম শামসুল আলম বলেন, বিইআরসিকে নিজস্ব ক্ষমতা ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুতের ন্যায্য বেঞ্চমার্ক দাম নির্ধারণ করতে হবে। এরপর প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা যেতে পারে।
শামসুল আলম আরও বলেন, ভবিষ্যতে দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বড় বাজার তৈরি হবে। তাই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। তাঁরা যাতে ভারতের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তিনি এ জন্য লাইসেন্স ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালুর ওপরও জোর দেন।
দাম নির্ধারণে স্বাধীন বিশ্লেষণ দরকার
গণশুনানিতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জনআস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেবউননেছা।
অধ্যাপক জেবউননেছা বলেন, শুধু প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে উৎপাদন খরচ, বেঞ্চমার্ক ও দেশ–বিদেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে হবে।
ট্যারিফ নির্ধারণের আগে পূর্ণাঙ্গ ব্যয়–সুবিধা বিশ্লেষণ প্রকাশেরও দাবি জানান অধ্যাপক জেবউননেছা। ওপেন অ্যাকসেসের প্রতিটি চার্জের (ফি) ভিত্তি স্পষ্ট করা, অদক্ষতার খরচ গ্রাহকের ওপর না চাপানো এবং বিলিং ও হিসাব–নিকাশে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান তিনি।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ওপেন অ্যাকসেস কাঠামো ব্যবসাবান্ধব করার কথা বলেন ফ্লোসোলারের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা আজিম কাসেম খান।
মোস্তফা আজিম কাসেম খান বলেন, অতিরিক্ত চার্জে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সঞ্চালন, বিতরণ ও অন্যান্য চার্জের যৌক্তিক হিসাব প্রয়োজন। একই ভোল্টেজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন চার্জ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগ, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রভাব বিবেচনা করতে হবে।
বিদ্যুতের দামের সঙ্গে অন্যান্য চার্জ যুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরী। তিনি মনে করেন, এসব চার্জ নির্ধারণে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও যাচাই করা বেঞ্চমার্ক থাকা দরকার।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দাম কম হলেও ব্যাকআপের খরচ যোগ হবে। তাই শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বিদ্যুৎ বিল কমবে কি না, সেটি স্পষ্ট করার কথা বলেন সাংবাদিক সেরাজুল ইসলাম।
গণশুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ব্যাটারি স্টোরেজের খরচসহ কয়েকটি বিষয় আরও যাচাই করা দরকার। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ নিয়ে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব বিষয় সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আরও পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর দাম বা অন্য কোনো প্রসঙ্গে কারও বক্তব্য বা দ্বিমত থাকলে আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে সেটা কমিশনে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গণশুনানিতে অংশ নেন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন খাতের সরকারি–বেসরকারি অংশীজনেরা।