মজার ইশকুলের শিশুরা একদিন বিশ্বমঞ্চে তাদের গল্প শোনাবে: আরিয়ান আরিফ

পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’–এ অতিথি হিসেবে অংশ নেন মজার ইশকুলের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আরিয়ান আরিফ (বাঁয়ে)ছবি: প্রথম আলো
তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন মজার ইশকুলের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আরিয়ান আরিফ।

‘অনেক শিশু রাস্তায় থাকে, কারণ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার মতো কেউ নেই। তাদের খাবার, পোশাক ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন। তাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার খাবার। এরপর পড়াশোনাকে আনন্দময় করে তোলা, যাতে শিশুরা চাপ অনুভব না করে। পাশাপাশি এমন প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখানো, যা দিয়ে তারা ভবিষ্যতে আয় করতে পারে। পুষ্টি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে দেখার পেছনে এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই কাজ করেছে।’

পডকাস্টে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন আরিয়ান আরিফ। পর্বটি প্রচারিত হয় গতকাল শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রচারিত হয়। আড্ডার শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, ২০১৩ সালে পথশিশুদের নিয়ে স্কুল শুরু করার ভাবনা কোথা থেকে এল?

আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার মনে হতো, জীবনে এমন কিছু একটা করতে চাই, যা মানুষের জন্য কাজে আসবে। তবে ঠিক কী করব, সে বিষয়ে তখন স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। জাহানারা ইমামের ‘‘একাত্তরের দিনগুলি’’ পড়তে পড়তে রুমির আত্মত্যাগ আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই জায়গা থেকেই শিশুদের জন্য কিছু করার চিন্তা আসে।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, রুমি আপনাকে কোন দিক থেকে অনুপ্রাণিত করেছেন?

আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘রুমির আত্মত্যাগ আমাকে দেশের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আমি যখন তাঁর জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়েছি, তখন মনে হয়েছে, প্রত্যেকের সময়ের বাস্তবতা আলাদা। রুমি তাঁর সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছেন। আমি স্বাধীন দেশে জন্মেছি। তাই আমার দায়িত্বও আলাদা। দেশের মানুষের জন্য কাজ করা, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো—এটাকে আমি আমার জায়গা থেকে দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা হিসেবে দেখি।’

শুরুতে খোলা আকাশের নিচেই চলত মজার ইশকুলের কার্যক্রম। বিষয়টি উল্লেখ করে সঞ্চালক জানতে চান, সেই দিনগুলোর কথা কি আপনার মনে পড়ে?

উত্তরে আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘শুরুর কয়েক দিন মজার ইশকুলের কোনো অবকাঠামো ছিল না; কিন্তু শিশুদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। খোলা আকাশের নিচে শিশুদের নিয়ে পড়াশোনা শেখানোর সেই দিনগুলো আসলে আমার কাছে এখনো খুব জীবন্ত।’

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘শিশুদের চ্যালেঞ্জ আর আমাদের চ্যালেঞ্জকে আমি আলাদা করে দেখি না। দিন শেষে আমরা অনেক সময় একই জায়গায় আটকে যাই। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি পায়; কিন্তু সেগুলো পূরণ হয় না। যেমন কোনো শিশু একটি ছোট ডকুমেন্টারি তৈরি করার জন্য কাজ করল, তাকে কিছু টাকা বা খাবার দেওয়ার কথা বলা হলো; কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি রাখা হলো না। এতে শিশুটি বিশ্বাস হারায়। ধীরে ধীরে তার আচরণেও এর প্রভাব পড়ে।’

আরিয়ান আরিফ আরও বলেন, ‘আমরা প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়েও একই সমস্যার মুখোমুখি হই। আমাদের সমাজে অনেক সময় ছোট ছোট প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা হয় না। পাঁচ মিনিটের কথা বলে দুই ঘণ্টা পরে আসা—এমন ছোট ঘটনাও বিশ্বাসের সংকট তৈরি করে। আমার মনে হয়, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারা আমাদের বড় একটি সামাজিক সমস্যা।’

২০১৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আপনার জীবনে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। সেটি কীভাবে মোকাবিলা করেছিলেন এবং সেখান থেকে কীভাবে ফিরে এসেছিলেন?

স্মৃতিচারণা করে আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। আমাদের প্রতিষ্ঠান তখন সরকারি নিবন্ধিত ছিল। ঘটনার আগের দিনও বনশ্রী থানার একজন কর্মকর্তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল। আমরা কী কাজ করি, আমাদের কাগজপত্র কী—সবকিছুই তাঁকে জানিয়েছিলাম। এমনকি শিশুদের অভিভাবক খুঁজে না পাওয়া গেলে সাময়িকভাবে তাদের রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল; কিন্তু পরদিন আমাদের আটক করা হয়। আমি তখনই বলেছিলাম, আমাদের কাছে সব প্রমাণ আছে এবং আমরা কোনো বেআইনি কাজ করছি না; কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি। পরে বুঝতে পারি, ঘটনাটি নিয়ে একটি সাজানো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।’

এ প্রসঙ্গে আরিয়ান আরিফ আরও বলেন, ‘এই অভিজ্ঞতায় আমাদের অনেক ভোগান্তি হয়েছে। এমনকি আমাদের কাছ থেকে টাকা দাবি করার ঘটনাও ঘটেছে। তারপরও আমরা কাজ থামাইনি। তবে এত বছর পরও বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি কথা বলিনি। কারণ, আমরা বাধা থেকে সহানুভূতি বা স্বীকৃতি চাইনি। আমাদের লক্ষ্য ছিল শিশুদের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া।’

আপনার প্রথম দিকের শিক্ষার্থী কুলসুম এখন তার পরিবারের সবচেয়ে শিক্ষিত সদস্য। কুলসুমের যাত্রা আপনাকে কীভাবে অনুপ্রাণিত করে?

উত্তরে আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘কুলসুম আমাদের প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের একজন। সে বর্ণপরিচয় থেকে শুরু করে এসএসসি পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। কুলসুমের সাফল্যের পেছনে তার নিজের ইচ্ছা, তার বাবার আন্তরিকতা এবং আমাদের সবার প্রচেষ্টা রয়েছে। তার বাবা পড়াশোনার সবকিছু বুঝতেন না; কিন্তু আমাদের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আমরা তার বাবাকে একটি রিকশা দিয়েছিলাম, যাতে পরিবারটি কিছু আয় করতে পারে। পরে তিনি আরও রিকশা কিনে আয় বাড়িয়েছেন এবং কিছু জমিও কিনেছেন। কুলসুমের এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল এবং তার পরিবারের পরিবর্তন আমাদের কাজের বড় অনুপ্রেরণা।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, বর্তমান সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় সামাজিক কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘সামাজিক কাজ শিশু-কিশোরদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পায়, নেতৃত্বের দক্ষতা তৈরি করে এবং নতুন কিছু শেখে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখে।’

আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘আমি মনে করি, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে নির্দিষ্ট কিছু ঘণ্টা সামাজিক কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে পারবে। আমরা মজার স্কুলে দেখেছি, বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে আসে। এমনকি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরাও এখানে কাজ করছে। তারা সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে শিখছে। এই অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’

আড্ডার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, আগামী দিনে মজার স্কুলকে কীভাবে দেখতে চান?

আরিয়ান আরিফ বলেন, ‘মজার স্কুল নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। আমি চাই, আমাদের কোনো শিশু একদিন বিশ্বের কোনো বড় সম্মেলনে দাঁড়িয়ে বলুক, তার শৈশব খুব কঠিন ছিল। সে হয়তো কমলাপুর, সদরঘাট বা কোনো বস্তিতে বড় হয়েছে; কিন্তু সেখানে একটি স্কুল ছিল, যেখানে সে পড়াশোনা করেছে এবং নিজের জীবন বদলানোর সুযোগ পেয়েছে। আমি ২০১৩ সাল থেকেই এই স্বপ্ন দেখি। এখন ২০২৬ সালে এসে মনে হচ্ছে, সেই দিন খুব দূরে নয়। আমাদের শিশুদের ফলাফল এবং তাদের অগ্রগতি আমাকে আশাবাদী করে তুলেছে।’