শুভ জন্মদিন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার
তাঁর জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৫ জুলাই। ৮৭ বছর পূর্ণ হলো। জীবনের ৮৮তম বর্ষের পথচলা তাঁর আজ শুরু। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। কী তাঁর পরিচয়? শিক্ষক? লেখক? টেলিভিশনের কিংবদন্তি বক্তা? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা? তিনি জবাব দেন, ‘আমার মনে হয়, এগুলোর সবই সত্যি, কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যি নয়।’
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্ম কলকাতায়, কিন্তু তিনি বলেন, ‘আমি পুরোপুরি পূর্ববঙ্গের মানুষ।’ তারপর শৈশবের গল্প চলে যায় বাগেরহাটে, সুন্দরবনে, বাঘে। এমনকি ঢাকার পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘ঢাকায় বাঘ আমি প্রায় দেখেছি…আমাকে আধা বাঘই বলতে পারো।’
বিভিন্ন সময় স্যারের অনেকগুলো সাক্ষাৎকার আমি নিয়েছি। সেসবের আলোকে এই লেখা লিখছি।
শৈশবের কথা উঠতেই একের পর এক স্কুলের নাম বলেন—করটিয়া, জামালপুর, পাবনা, বাগেরহাট। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আবেগ নিয়ে বললেন তাঁর বাবার কথা। আযীমউদ্দিন আহমদ। ইংরেজিতে এমএ, বাংলাতেও এমএ, গণিতে কখনো ১০০-এর নিচে নম্বর পাননি। তারপর বললেন, ‘আব্বা একটা অন্ধকার গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন, যেখানে সাত মাইলের মধ্যে কোনো স্কুল ছিল না।’
পরে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করি আপনি শিক্ষক হলেন কেন, তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললেন, ‘সবচেয়ে বেশি প্রভাব আমার আব্বার। ছাত্ররা যখন আব্বা সম্পর্কে কথা বলত, তখন মনে হতো কোনো দেবতার কথা বলছে। তখন মনে হতো, যদি হতেই হয়, তাহলে দেবতা হওয়াই ভালো।’
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘আজকাল প্রায়ই শুনি, শিক্ষকদের আর আগের সম্মান নেই। এটা হতে পারে না। সম্মানযোগ্য লোকের সম্মান নেই—এটা অসম্ভব। যদি সম্মান না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, ওই অসম্মানের যোগ্যতা তার নিজের মধ্যেই সম্ভবত আছে।’
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর অনেকে ভেবেছিলেন এখন একটা কাঁথা ভালো করে মুড়ি দিয়ে ঘুম দিলেই বাংলাদেশসোনার বাংলা হয়ে যাবে। কিন্তু সোনার বাংলা মানে সোনার রাস্তা নয়, সোনার দালান নয়। সোনার বাংলা মানে সোনার মানুষ। আলোকিত মানুষ।’
১৯৭৮ সালে ১০ জন ছাত্র নিয়ে পাঠচক্রের শুরু। প্রত্যেকে ৩৫ টাকা করে দিল। জসীমউদ্দীনের নক্সী কাঁথার মাঠ–এর ১০টি কপি কেনা হলো। বই পড়া হলো। তারপর আলোচনা। তাঁর ভাষায়, ‘বইটাকে একেবারে তন্নতন্ন করে দেখা—কেন তিনি লিখেছেন? কী বলতে চান লেখক?’ একটি জাতির পরিবর্তন তিনি শুরু করতে চেয়েছিলেন একটি বই দিয়ে।
আমি তাঁকে বলেছিলাম, পৃথিবীর নানা দেশে যাই, কত মানুষ এসে বলে, ‘আমরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাত্র।’ তিনি মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমিও দেখি। সোয়া দুই কোটির বেশি ছেলেমেয়েকে আমরা স্পর্শ করেছি। তার মধ্যে যদি দশ-বিশ লাখও দেশের জন্য কিছু করে, সেটাই তো বড় প্রাপ্তি।’
আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ১০৬ বছর পর্যন্ত বাঁচার ইচ্ছা আছে? তিনি বলেছিলেন, ‘এগুলো দিয়ে কী করব? এই জীবনটা তো একটা গিফট। আমি তো একটা ব্যাঙ হয়েও জন্মাতে পারতাম…সেখানে আমি মানুষ হয়ে জন্মেছি। এত অনুভূতি নিয়ে জন্মেছি। এত বিস্ময়কর, এত আনন্দময় পৃথিবীতে জন্মেছি। তারপরও অনেকে বলে, পৃথিবীতে কিছু পাইনি। আমি এই ধরনের মানুষকে ধিক্কার দিই।’
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মধ্যে একটা অতৃপ্তি সব সময় কাজ করে। তা হলো, তিনি আসলে লেখক হিসেবে পরিচিত হতে চেয়েছিলেন। গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, আত্মকথা, ভ্রমণকাহিনি—নানা বিষয়ে অনেকগুলো বই আছে তাঁর, তাঁর রচনাসমগ্র আয়তনে বিশাল। কিন্তু বাংলাদেশে একই মানুষ অনেকগুলো কাজ করলে তাঁর পরিচয় নিয়ে লোকের মনে অস্পষ্টতা থাকে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সংগঠক পরিচয়টাই এখন হয়তো সামনে আসে। কিন্তু তিনি একজন সার্বক্ষণিক বেদনাতুর একজন লেখক। আর লেখক হৃদয়টি নবীনতম লেখক কিংবা প্রেমিকের মতোই ভীরু, কম্পমান, সংশয়াকুল; কিন্তু পৃথিবী জয় করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে সদাসক্রিয়। এখনো তিনি লিখে চলেছেন।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের স্বাস্থ্য এখন খুব একটা ভালো নেই। কিছুদিন আগে ফিরলেন হাসপাতাল থেকে।
তাঁকে বলেছিলাম, ষাটের দশকে আপনার প্রতিষ্ঠিত কণ্ঠস্বর যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক পথ রচনায় আরও অনেকের সঙ্গে বড় অবদান রেখেছে, তা কি ভেবে দেখেছেন? নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান থেকে শুরু করে রফিক আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস—এঁরাই তো বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কাব্যিক ও সাহিত্যিক নির্মাতা!
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর উচ্চতম ভবন সিয়ার্স টাওয়ারের (এখন উইলিস টাওয়ার) নির্মাতা ফজলুর রহমান খানের একটা উদ্ধৃতি ছিল ধাতব ভাস্কর্যের নিচে, ‘একজন প্রযুক্তিবিদের নিজের প্রযুক্তিতে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয় একেবারেই। তাঁকে অবশ্যই জীবনকে উপভোগ করতে জানতে হবে। আর জীবন হলো শিল্প, নাটক, সংগীত আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জীবন হলো মানুষ।’
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, তুমি ডাক্তার হলে শ্রেষ্ঠ ডাক্তার হও, প্রকৌশলী হলে শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী হও, আর একটু ভালো মানুষ হও। সে জন্যই বই, সে জন্য কবিতা, সে জন্য শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা। সে জন্যই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। আলোকিত মানুষ চাই নামের এক স্বপ্নের নির্মাণে কাজ করে চলা।
শুভ জন্মদিন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। আপনার আলোর পথচলা দীর্ঘ হোক। আপনার স্বপ্নে আলোকিত হোক আরও বহু প্রজন্ম।