দেশে ফিরেছেন বাংলার জয়যাত্রার নাবিকেরা
‘অনেক সিম্যান ট্রমাটাইজড হয়ে গেছে, মারা গেছে, কেউ চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসেনি’
পারস্য উপসাগরে চার মাস অবরুদ্ধ থাকার সময় অনেক জাহাজের নাবিকেরা ট্রমাটাইজড (মানসিকভাবে বিপর্যস্ত) হয়ে পড়েছিলেন, কেউ কেউ মারাও গেছেন, কিন্তু তাঁদের চিকিৎসার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। তখন অনেক জাহাজ খাবার-পানি পায়নি, কোনো কোনোটি প্রণালি পার হতে গিয়ে ডুবেও গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়েছিল বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। ৩ মাস ২৫ দিন পর গত ২৩ জুন রাতে হরমুজ প্রণালি পার হয় জাহাজটি। ওই জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম আজ দেশে ফিরে সেই অবরুদ্ধ দশার কথা তুলে ধরেছেন।
সন্ধ্যায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন শফিকুল ইসলাম। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান থেকে রওনা হয়ে আজ বিকেলে তাঁদের বহনকারী উড়োজাহাজটি দেশে পৌঁছায়।
সংবাদ সম্মেলনে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা দ্বিতীয় জীবন পেলাম…দেশবাসী যাঁরা দোয়া করেছেন, মানসিক সাপোর্ট দিয়েছেন, প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নিয়েছেন, সবার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।’
বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে নিরাপদে ফিরে আসতে পেরেছেন বলে জানান শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় যখন জাহাজের ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র যাচ্ছিল এবং পাশে জাহাজ ডুবে যাচ্ছিল, তখন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার হোটেলে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় তাঁরা জাহাজ ছেড়ে যাননি।
জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে ক্যাপ্টেন শফিকুল বলেন, এক রাতে তাঁদের পাশের বার্থে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে তেলের একটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়, যা ছয়টি টাগবোট দিয়েও নেভানো যায়নি। তিনি জানান, ওই ট্যাংকারের ৪০টি ট্যাংকের যেকোনো একটি বিস্ফোরিত হলে তার আগুন তাঁদের জাহাজেও ছড়িয়ে পড়তে পারত।
জাহাজের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় সে সময় সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল নেভিগেশনের মাধ্যমে জাহাজ চালাতে হয়েছে তাঁদের। এলাকায় মাইন থাকায় সামান্য বিচ্যুতিতেও বিস্ফোরণের ঝুঁকি ছিল।
নাবিকেরা বিমানবন্দরের টার্মিনালে প্রবেশ করলে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে তাঁদের স্বাগত জানান। বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন নাবিকদের স্বজনেরা। সংবাদ সম্মেলন শেষে তাঁরা বাইরে বের হলে স্বজনেরা তাঁদের জড়িয়ে ধরেন। এ সময় বিমানবন্দরের টার্মিনালের বাইরে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ভারত থেকে পণ্য নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে বাংলার জয়যাত্রা। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি। এর পরদিনই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সংঘাত শুরু হলে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে পারস্য উপসাগরেই আটকা পড়ে জাহাজটি। ১১৫ দিন পর ইরানি বাহিনীর অনুমতি পেয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে জাহাজটি।