প্রথম আলো এক্সপ্লেইনার
হাসপাতালে অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে দলিলে সই নিলেই কি জমির মালিকানা বদলে যায়
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন শারীরিকভাবে দুর্বল এক বৃদ্ধ। সামনেই এক নারী একটি কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ৩ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দাবি করা হয়, বৃদ্ধের সামনে থাকা নারী তাঁর মেয়ে। তিনি জোর করে জমিসংক্রান্ত দলিলে বৃদ্ধের স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালের বিছানায় বসে অসুস্থ বৃদ্ধের কাছ থেকে জমির কাগজে সই করিয়ে নেওয়ার নৈতিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনরা।
পাশপাশি অনেকের মধ্যে কৌতূহলও জেগেছে এভাবে আসলেই জমি লিখে নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে। বাড়িতে বা হাসপাতালে বসে আগে থেকে দলিলে সই করে রাখলে তার আইনি গুরুত্ব কতটা আর দলিলে সই করা ও দলিল রেজিস্ট্রি করা—দুটির মধ্যে পার্থক্যটাই কী।
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রথম আলো কথা বলেছে সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রি কর্মকর্তাদের সঙ্গে। পাশাপাশি দেখা হয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনের ধারাগুলোও। তাতে জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্বাক্ষরের পাশাপাশি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের কথা সামনে আসে।
জমির দলিল কোথায় রেজিস্ট্রি করতে হয়
জমি বেচাকেনার দলিল যেকোনো জায়গায় নিয়ে গিয়ে রেজিস্ট্রি করা যায় না। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী সাধারণভাবে জমির পুরোটা বা বড় অংশ যে উপজেলায় অবস্থিত, সেই এলাকার সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে দলিল উপস্থাপন করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রি কর্মকর্তা রেজিস্ট্রি কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।
ভূমি রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া মূলত রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়। এ আইনে কোন দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে, কোথায় ও কীভাবে তা করতে হবে এবং দলিলদাতা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতি ও পরিচয় যাচাইয়ের বিধান রয়েছে।
তবে জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শুধু সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এবং স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯-সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনও প্রয়োগ হয়।
রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৪ ধারায় বলা হয়েছে, দলিলের সম্পাদনকারীদের নিবন্ধন কর্মকর্তার সামনে হাজির হতে হবে। এরপর নিবন্ধন কর্মকর্তা অনুসন্ধান করবেন—দলিলটি যাঁরা করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাঁরা সত্যিই সেটি সম্পাদন করেছেন কি না। একই সঙ্গে তাঁদের পরিচয়ও যাচাই করতে হবে।
রেজিস্ট্রি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাবরেজিস্ট্রারের সামনে দলিল উপস্থাপনের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যাচাই, দলিলের বিষয় এবং সম্পাদনের বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া রয়েছে। দাতা বা বিক্রেতা দলিলটি নিজের ইচ্ছায় করেছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
খরচ কত
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, দলিলের ধরন, জমির মূল্য, অবস্থান এবং হস্তান্তরের ধরন অনুযায়ী সরকারি ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক ও বিভিন্ন কর দিতে হয়। সাধারণ বিক্রয় দলিলের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি দলিল মূল্যের ১ শতাংশ এবং স্ট্যাম্প শুল্ক ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এর সঙ্গে স্থানীয় সরকার কর এবং উৎসে কর যুক্ত হয়। তবে এসব করের হার সারা দেশে এক নয়; জমির অবস্থান, শ্রেণি ও হস্তান্তরের ধরন অনুযায়ী হার ভিন্ন হতে পারে।
বিশেষ করে উৎসে করের ক্ষেত্রে শুধু জমির মূল্যের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ ধরে হিসাব করা ঠিক নয়। ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধানে জমির অবস্থান ও শ্রেণিভেদে উৎসে করের হার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণের বিধান রয়েছে। ফলে একই দামের জমি হলেও এলাকাভেদে রেজিস্ট্রির মোট খরচে পার্থক্য হতে পারে। এর বাইরে দলিলের ধরন অনুযায়ী ই-ফি, নকলনবিশ বা অন্যান্য সরকারি ফি এবং দলিল লেখকের পারিশ্রমিক থাকতে পারে।
আবার মা–বাবার সঙ্গে সন্তানদের মধ্যে হেবা বা নির্দিষ্ট ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি সাধারণ বিক্রয় দলিলের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। তবে এর বাইরেও জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় অনানুষ্ঠানিক খরচ বা উৎকোচ দিতে হয় বলেও অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
দলিলে সই করলেই কি মালিকানা বদলে যায়
জমি হস্তান্তরের বিষয়টি বুঝতে হলে শুরুতেই একটি পার্থক্য পরিষ্কার করা দরকার—দলিলে স্বাক্ষর করা আর দলিল নিবন্ধন করা এক বিষয় নয়।
বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, জমি বিক্রি, দান বা অন্য কোনোভাবে মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যেসব দলিলের নিবন্ধন আইনত বাধ্যতামূলক, সেগুলো নিবন্ধন ছাড়া জমিতে নতুন মালিকের আইনগত অধিকার সৃষ্টি বা হস্তান্তর সম্পন্ন হয় না।
রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ ধারায় স্থাবর সম্পত্তির বিভিন্ন ধরনের হস্তান্তর-সংক্রান্ত দলিলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর ৪৯ ধারায় বলা হয়েছে, নিবন্ধনযোগ্য কোনো দলিল নিবন্ধিত না হলে সেটি স্থাবর সম্পত্তির অধিকার সৃষ্টি, ঘোষণা, হস্তান্তর, সীমিত বা বিলুপ্ত করতে পারবে না। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি হাসপাতালের বিছানায় বসে একটি দলিলে স্বাক্ষর করলেন—এটিই জমির মালিকানা বদলে যাওয়ার শেষ ধাপ নয়।
রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী, উইল ছাড়া নিবন্ধনযোগ্য দলিল সাধারণভাবে সম্পাদনের তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধনের জন্য উপস্থাপন করতে হয়। তবে বাস্তবে অনেকেই দলিলে আগে থেকেই স্বাক্ষর করে রাখেন। এর একটি বাস্তব কারণ হলো সময় বাঁচানো।
টিপসই গুরুত্বপূর্ণ
জমি নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় দাতার স্বাক্ষরের পাশাপাশি তাঁর টিপসই বা আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। এটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলছেন বিশেষজ্ঞেরা।
রেজিস্ট্রি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিবন্ধন অফিসে দলিল সম্পাদনকারীকে শনাক্ত করা এবং নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার অংশ হিসেবে এসব তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। দাতা এবং ক্রেতা উভয়কেই নিবন্ধন কর্মকর্তার সামনে হাজির হওয়া, দলিলের সম্পাদন স্বীকার করা এবং পরিচয় নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য নিয়ম কী
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হাসপাতালের ঘটনাটিতে ফিরে আসা যাক। যদি এমন হয়, জমির মালিক গুরুতর অসুস্থ। তিনি হাসপাতালের বিছানায় আছেন। হাঁটতে পারছেন না। সাবরেজিস্ট্রি অফিসে গেলে তাঁর শারীরিক ঝুঁকি বা গুরুতর অসুবিধা হতে পারে। তাহলে রেজিস্ট্রেশন আইনেই এর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।
আইনের ৩৮ ধারায় শারীরিক অসুস্থতা বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিবন্ধন অফিসে উপস্থিত হতে না পারা ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অফিসে সরাসরি উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই ধারায় কারাগারে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা রয়েছে।
এই ব্যবস্থাই সাধারণভাবে কমিশন প্রক্রিয়া বা কমিশন দলিল হিসেবে পরিচিত। কমিশন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো যিনি শারীরিক কারণে নিবন্ধন অফিসে যেতে পারছেন না, তাঁর কাছে নিবন্ধন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত কর্মকর্তা গিয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।
অর্থাৎ অসুস্থ ব্যক্তি যদি হাসপাতালে থাকেন, তাহলে পরিবারের কেউ নিজের উদ্যোগে একটি দলিল নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে সই করিয়ে নিলেই সেটি কমিশন প্রক্রিয়া হয়ে যায় না।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাবরেজিস্ট্রার ও ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিশেষজ্ঞ মো. শাহাজাহান আলী প্রথম আলোকে বলেন, অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘ভিজিট’ বা ‘কমিশন’ প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা হাসপাতালে যেতে পারেন। ভিজিটে সাধারণত সাবরেজিস্ট্রার নিজেই যায়।
শাহাজাহান আলী বলেন, রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে রেজিস্ট্রি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কমিশনের ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্রি অফিসের একজন কর্মকর্তা উপস্থিত থেকে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।