বাংলাদেশের অটোমোবাইল ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা করল এসিআই মটরস্। দেশের বাজারে নিয়ে এল ইয়ামাহার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ‘এফজেড-এস হাইব্রিড’ মোটরসাইকেল।
শুক্রবার রাজধানীর হোটেল লো মেরিডিয়ানে আয়োজিত জমকালো অনুষ্ঠানে বাইকটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করে বাংলাদেশে ইয়ামাহার একমাত্র পরিবেশক ও টেকনিক্যাল কোলাবরেটেড পার্টনার এসিআই মটরস্। এর মাধ্যমে হাইব্রিড মডেলের এই মোটরসাইকেল নিয়ে বাইকপ্রেমীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটল। পাশাপাশি রাইডিং টেকনোলজিতে এক নতুন উচ্চতা স্পর্শ করল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে গেম-চেঞ্জিং প্রযুক্তিসম্পন্ন এফজেড-এস হাইব্রিড মোটরসাইকেল আনার ঘোষণা দেন এসিআই মটরসে্র ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস। এ সময় অনলাইনে যুক্ত ছিলেন ইয়ামাহা মটরস ইন্ডিয়ার সেলস্ ডিরেক্টর হিরোশি সেতোগাওয়া। অনুষ্ঠানে ইয়ামাহা এবং এসিআই মটরসে্র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, ‘এসিআই মটরস্ বাংলাদেশে প্রথম ‘‘ফুয়েল ইনজেকশন’’ বা এফআই প্রযুক্তি এনেছে। যার ফলে আমরা কমপক্ষে দেশের এক হাজার কোটি টাকার ফুয়েল সেভ (সংরক্ষণ) করেছি। শুধু তা–ই নয়, এসিআই মটরস্ বাংলাদেশে প্রথম এবিএস বাইক লঞ্চ করেছে। পরবর্তীতে আমাদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের অন্য বাইক ব্র্যান্ডগুলো এ প্রযুক্তি এবং ফিচারগুলো নিজেদের বাইকে অন্তর্ভুক্ত করছে।’
সুব্রত রঞ্জন দাস আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন প্রযুক্তির পরিচয় করানোর ক্ষেত্রে ইয়ামাহা ও এসিআই মটরস্ সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় এফজেড-এস হাইব্রিড মোটরসাইকেলটি শুধু ফুয়েল সাশ্রয় করবে না, বরং কুইক পিকআপ এবং স্মুথ রাইডিং নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া ‘‘কুইক গিয়ার শিফটিং’’ এবং এর ‘‘ডিজিটাল মিটার’’ তরুণ বাইকপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক ও ব্যবহারবান্ধব হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’
গত ছয় মাসে ইয়ামাহা বাইক ইন্ডাস্ট্রিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, ‘এ অর্জন সম্ভব হয়েছে ইয়ামাহা রাইডার্স ক্লাবের ২৫ হাজার সদস্য এবং ইয়ামাহা রাইডারদের জন্য। কারণ, তাঁদের কাছে ইয়ামাহা শুধু বাইক নয়, এটি তাঁদের লাইফস্টাইল।’
কেন আলাদা এফজেড-এস হাইব্রিড
এই বাইকটিতে এমন কিছু আধুনিক ফিচার যুক্ত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের টু-হুইলার ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। সেগুলো হলো—
উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইব্রিড ইঞ্জিন: এই বাইকটিতে তেল ও ব্যাটারির সমন্বয়ে তৈরি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইব্রিড ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। যা কেবল গতি নয়, বরং প্রযুক্তির এক অনন্য মিশেল।
সর্বোচ্চ জ্বালানি সাশ্রয় ও মাইলেজ: হাইব্রিড সিস্টেমের ফলে বাইকটি সাধারণ ইঞ্জিনের তুলনায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। ফলে রাইডাররা অন্যান্য বাইকের তুলনায় অনেক বেশি মাইলেজ পাবেন।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই যাতায়াত: ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে এই বাইকটি একটি সবুজ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
গাড়ির সমমানের নিরাপত্তা ফিচার: বাইকটিতে রয়েছে এবিএস এবং টিসিএস প্রযুক্তি, যা সাধারণত দামি প্রিমিয়াম গাড়িতে ব্যবহৃত হয়। এটি যেকোনো রাস্তায় রাইডারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
স্মার্ট কানেক্টিভিটি ও নেভিগেশন: এতে রয়েছে ৪.২ ইঞ্চি ফুললি লোডেড টিএফটি ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং ব্লুটুথ কানেক্টিভিটি। এ ছাড়া রাইডারদের সুবিধার্থে যুক্ত করা হয়েছে ‘টার্ন বাই টার্ন’ নেভিগেশন সিস্টেম গিয়ার ইনডিকেটর।
স্মার্ট স্টপ অ্যান্ড স্টার্ট সিস্টেম: এ ছাড়া ট্রাফিক জ্যামে বারবার ইঞ্জিন চালু-বন্ধের ঝামেলা কমাতে এতে আছে ‘স্টপ অ্যান্ড স্টার্ট সিস্টেম’। এই সিস্টেমের কারণে সিগন্যালে থামার পর হাইব্রিড টেকনোলজির সাহায্যে বাইকটি সহজেই স্টার্ট হবে এবং ব্যাটারি থাকার কারণে ইঞ্জিনের ওপর চাপ কম পড়বে। ফলে এটি আরও ‘ফুয়েল ইফিশিয়েন্ট’ হবে।
প্রিমিয়াম লাইটিং ও পারফরম্যান্স: বাইকটির রেডি পিকআপ দেবে গতির রোমাঞ্চ। সঙ্গে থাকা এলইডি হেডলাইট, টেল লাইট এবং এলইডি ইন্ডিকেটর বাইকটিকে দিয়েছে একটি আধুনিক ও মাসকুলার লুক।
দাম ও রং: ‘সায়ান মেটালিক গ্রে’ এবং ‘রেসিং ব্লু’—প্রাথমিকভাবে বাইকটি এ দুটি আকর্ষণীয় রঙে পাচ্ছেন ক্রেতারা। এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমানে অফার মূল্য ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা। মোটরসাইকেলটি কিনতে গ্রাহকদের দিতে হবে প্রি-বুকিং। শুধু প্রি–বুকিং দেওয়া গ্রাহকেরাই ৬ হাজার টাকা ছাড়ে অফারটি উপভোগ করতে পারবেন।
বিক্রয়োত্তর সেবা: প্রতিষ্ঠানসূত্রে জানা যায়, দেশের বাইক ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ইয়ামাহা তাদের গ্রাহকদের কম সময়ে সর্বোচ্চ বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করে। এ সেবা শুধু সার্ভিস সেন্টারে এসেই নয়, গ্রাহকেরা অনলাইনেও পেতে পারেন, যা অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যতিক্রম।
মোটরসাইকেল বাজারে হাইব্রিড যুগের সূচনা
অটোমোবাইল জগতে হাইব্রিড প্রযুক্তির বিষয়টি এখন বেশি আলোচিত। তবে এই প্রযুক্তি গাড়ির ক্ষেত্রে যতটা পরিচিত, মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই নতুন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজার যখন সিসি লিমিট এবং সাধারণ ইঞ্জিনের বৃত্তে আটকে ছিল, তখন এসিআই মটরস্ একের পর এক বিশ্বমানের প্রযুক্তি (যেমন এফআই, এবিএস) এনে বাজারের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ইয়ামাহার এই সাহসী পদক্ষেপ দেশের অন্যান্য ব্র্যান্ডের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ এবং অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।