হামে আক্রান্ত আঁখি হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে, মাকতুমকে নিয়েও উদ্বিগ্ন মা
প্রচণ্ড জ্বরে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে ১২ বছরের কিশোরী আঁখি আক্তার। জ্বরের দাপটে চোখ–মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মেয়েটির। একনাগাড়ে মেয়ের মাথায় জলপট্টি দিয়ে চলেছেন মা খাদিজা খাতুন। আর পাশেই নির্বাক দাঁড়িয়ে মেয়ের এই কষ্ট দেখছেন বাবা আমির হোসেন। চোখে–মুখে তাঁদের রাজ্যের দুশ্চিন্তা।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য। গতকাল সোমবার রাতে কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা থেকে মেয়েকে নিয়ে এই হাসপাতালে ছুটে এসেছেন তাঁরা। রাতে চিকিৎসক আঁখিকে দেখার পর জানান, সে হামে আক্রান্ত। এরপরই তাকে ভর্তি করা হয়।
আঁখির জীবনে অসুস্থতার ধাক্কা অবশ্য এটাই প্রথম নয়। বাবা আমির হোসেন জানালেন, কিছুদিন আগেই আঁখির জলবসন্ত হয়েছিল। তখন স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে এই হাসপাতালেই টানা ১০ দিন চিকিৎসা নিয়ে গত ১১ মার্চ বাড়ি ফেরেন তাঁরা। কিন্তু স্বস্তি টেকেনি বেশি দিন। দুই দিন আগে আবারও সে অসুস্থ হয়ে পড়ে, শরীরে দেখা দেয় হামের উপসর্গ ফুসকুড়ি। দেরি না করে মেয়েকে নিয়ে আবারও এই চেনা হাসপাতালেই ছুটে এসেছেন মা–বাবা।
আমির হোসেন ও খাদিজা দম্পতির যমজ সন্তান আঁখি। মা খাদিজা আক্ষেপ করে বলছিলেন, ছোটবেলায় আঁখি টানা কয়েক মাস খুব অসুস্থ ছিল। তাই সময়মতো তাকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। বয়স এক বছর পার হওয়ার পর হামের টিকা দিতে গেলে স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় আর টিকা দেওয়া যাবে না। সেই টিকাহীনতার মাশুলই যেন এখন গুনতে হচ্ছে মেয়েটিকে।
আঁখি এবার সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছে। সামনেই পরীক্ষা। কিন্তু একের পর এক অসুস্থতায় তার পরীক্ষা দেওয়া এখন অনিশ্চয়তার মুখে। মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত বাবা। তবে মা খাদিজা খাতুনের বড় ভরসা এখানকার চিকিৎসকদের ওপর। তিনি বলেন, ‘মাইয়াডারে নিয়া কিছুডা চিন্তায় আছি। তয় এর আগে চিকিৎসা কইরা গেছি, ভালোই চিকিৎসা পাইছি। এই জন্য কোনহানে না নিয়া এইখানে নিয়া আসছি। চিকিৎসা প্রথম ভালা পাইছি, এখনো তো চিকিৎসা ভালোই দিবে। এ জন্য নিয়া আইছি।’
শুধু আঁখি নয়, এই হাসপাতালে এখন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে আরও অনেক শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছে চারজন। এদেরই একজন মাত্র পাঁচ মাস বয়সী শিশু মাকতুম বিল্লাহ। গতকাল রাতে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে ছেলেকে নিয়ে ছুটে এসেছেন মা নিপা বেগম। প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসক নিউমোনিয়া বললেও, এখানে আসার পর জানা যায়, নিউমোনিয়ার পাশাপাশি শিশুটির হামও হয়েছে।
নিপা বেগমের গল্পটাও অনেকটা খাদিজার মতোই। তিনি জানান, কিছুদিন আগে ছেলের ডায়রিয়া হওয়ায় টানা ৯ দিন মহাখালীর কলেরা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। গত ১ মার্চ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু গতকাল ছেলের অবস্থা আবারও খারাপ হলে একাই ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন তিনি। বড় ছেলে মুয়াজকে (৩) রেখে এসেছেন বাবা লিটনের কাছে। এখন ছোট্ট মাকতুমের সুস্থতার আশায় কাটছে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এম আসমা খান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালটিতে ২৪ জন রোগী এসেছে, যার মধ্যে ৪ জনকে ভর্তি নেওয়া হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। তিনি আরও বলেন, হামের প্রকোপ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম নিয়ে এ হাসপাতালে ৪০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হাম শনাক্ত হওয়া ৭টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।