এর আগে ২ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর এজলাসে হট্টগোল, বিচারক ও আদালতের কর্মচারীদের গালিগালাজ ও অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নজরে আসার পর হাইকোর্ট ৫ জানুয়ারি আদালত অবমাননার স্বতঃপ্রণোদিত রুল দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. তানভীর ভূঞাসহ তিন আইনজীবীকে তাঁদের ভূমিকার ব্যাখ্যা দিতে ১৭ জানুয়ারি আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় ক্ষিপ্ত হয়ে গত ৫ ও ৮ জানুয়ারি এজলাস চলাকালে কতিপয় আইনজীবী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা জজ শারমিন নিগারের বিরুদ্ধে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেন। এতে বিচারকাজ বিঘ্নিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিকার চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর ৯ জানুয়ারি একটি চিঠি পাঠানো হয়।

বিষয়টি উপস্থাপনের পর ১০ জানুয়ারি হাইকোর্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মফিজুর রহমানসহ ২১ জনের প্রতি আদালত অবমাননার রুল দেন। ব্যাখ্যা জানাতে তাঁদের আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ধার্য তারিখ ১৭ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. তানভীর ভূঞাসহ তিন আইনজীবী আদালতে হাজির হন। তাঁদের পক্ষে সেদিন সময়ের আরজির পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ১৪ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী দিন রাখেন।

আজ আদালতে ২১ জনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক আবদুন নূর, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ শুনানিতে ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়।
শুরুতে ২১ জনের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ২১ জন হাজির হয়েছেন। আদালত অবমাননার আরেকটি বিষয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখ রয়েছে। একসঙ্গে শুনানি হোক।

আদালত বলেন, ‘দুটি ঘটনা এক নয়। দিন দিন স্কেল (মাত্রা) বাড়ছে। এটি অশ্লীল একটি ঘটনা। আগেরটি ছিল দাম্ভিকতা ও বেয়াদবি। আর এটি হচ্ছে অশ্লীল। এসএসসি পাস কোনো লোকও এ রকম কথা বলে না। এখানে দেখি দুজন শিক্ষানবিশ আছেন, উনারা কারা?’

তখন শফিকুল ইসলাম ও কাজী ইকবাল নামে দুজন শিক্ষানবিশ ডায়াসের সামনে আসেন। কোন কলেজ থেকে পাস করেছেন, সিনিয়র কে—আদালতের এমন প্রশ্নের উত্তর দেন তাঁরা।

মৃদুস্বরে শফিকুল নিজের নাম বলেন। তখন আদালত বলেন, ‘আপনার সাউন্ড তো অনেক বড়। পেছনের জনের নাম কী?’ আদালতের প্রশ্নের জবাবে অপর শিক্ষানবিশ বলেন, কাজী ইকবাল।

আদালত বলেন, ‘অশ্লীল স্লোগান! কমলাপুরের কুলিরাও তো এমন করে না। এটি কোনো ভাষা? সব আইনজীবী শ্রেণির লজ্জিত হওয়া উচিত। কালো পোশাকধারী কোনো ব্যক্তি এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারেন? এমন ভাষা ব্যবহার করতে দেখিনি। এটি কোন রাজনৈতিক ভাষা, কোন আন্দোলনের ভাষা? এত অশ্লীল!’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক আবদুন নূর বলেন, ‘সময় দেন, তারপরে বিষয়টি আসুক।’
আদালত বলেন, ‘গত দিনও সময় দিয়েছি। আজকেও সময় দিচ্ছি। কিন্তু আমরা খুবই চিন্তিত।’

মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ‘আমারও। জুডিশিয়ারি আমাদের সবার। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’
আদালত বলেন, ‘তাই যদি হয়, যে গালি দিয়েছেন, তা আপনার গায়েও লেগেছে।’

মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ‘কী হয়েছে, তা দেখব। যদি না দিয়ে থাকে, সেটিও দেখব। উদ্দেশ্য কী, তা–ও দেখব।’

আদালত বলেন, ‘আমরা সারা দেশের নিম্ন আদালতের অভিভাবক। আমাদের দায়িত্ব আছে। আপনারা আপনাদের সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধা সুপ্রিম কোর্টে বলতে পারেন।’

সমিতির সম্পাদক আবদুন নূর বলেন, ‘আমাদেরও অভিভাবক সুপ্রিম কোর্ট।’

আদালত বলেন, ‘আপনাদের বিজ্ঞ বলে, আমাদেরও বিজ্ঞ বলে। বিজ্ঞের সঙ্গে ওই শব্দগুলো যায়?’
আদালত আরও বলেন, ‘এখন কী অবস্থা?’

বার কাউন্সিলের সদস্য মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোর্ট চলছে। বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ২৮ তারিখে সাধারণ সভা ডাকা হয়েছে। বর্ধিত সভা, কমিটির সদস্যরা থাকবেন। এই বার্তা দেব, তারপরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছি।’

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘উনার সময় চেয়েছেন, সময়টা দেন। এর মধ্যে বার কাউন্সিলের সদস্য যেটি বললেন ২৮ তারিখে সভার কথা। সব আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধিরা আসবেন। আলোচনা করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সম্পাদক আছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আগের দিন এসেছিলেন, সাধারণ সম্পাদক আছেন। উনাদের সঙ্গে বসে কথা বলে দরকার হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাব। যাদের সঙ্গে প্রয়োজন মনে করব, সবার সঙ্গে কথা বলব।’

আদালত বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আছেন?’

তখন অ্যাটর্নি জেনারেল ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন। পরে ডায়াসের কাছে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটনার সময় উনি (সমিতির সাধারণ সম্পাদক) সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। যেহেতু সমিতির সাধারণ সম্পাদক, তাই তাঁর নাম চলে এসেছে। ২০০৬ সালে যখন আমি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ছিলাম, তখন কোনো ঘটনা ঘটলেই আমাদের নাম চলে আসত। আদালত অবমাননার রুল হোক, ফৌজদারি মামলা হোক নাম চলে আসত। অথচ আমরা ছিলামও না।’

আদালত বলেন, ‘আমরা দেখব। হলফনামা দেওয়ার সময় আলাদাভাবে দেবেন। কে কীভাবে ছিল, তা দেখব। সেদিনের ঘটনা সেখানে শেষ হলো একরকম হতো। দিন যায়, এটার পটপরিবর্তন হচ্ছে, রূপ পরিবর্তন হচ্ছে। এতে সবারই ক্ষতি।’

দুই শিক্ষানবিশের উদ্দেশ্যে আদালত বলেন, ‘এরা এখনো সনদই পাননি। এসব কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততায় তারা কোথায় যাবে? এদের ভবিষ্যৎ কী?’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘ওরা ছিল না বলছে।’

এই পর্যায়ে আদালত বলেন, ‘কোর্টের যে বার্তা, তা বলবেন। আমরা ইচ্ছা করলে সর্বোচ্চ যেতে পারি।

আজীবনের জন্য লাইসেন্স ক্যানসেল করে দিতে পারি। বার কাউন্সিলের আচরণবিধির লঙ্ঘন, জাতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের লঙ্ঘন, আদালত অবমাননা তো আছেই। সুতরাং যেতে চাইলে আমরা অনেক দূর যেতে পারি।...তাদের কনডাক্ট, বিহেভিয়র...জুনিয়র (শিক্ষানবিশ) সারা ৬৪ জেলার বিষয়, এগুলো। তাদের বার্তা দেবেন।’

এ সময় মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ‘বলব, মাই লর্ড।’

এরপর আদালত ১৯ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী দিন রাখেন।