উপকূলের নারীদের সংগ্রাম থেকে স্বনির্ভরতার গল্প

নিজের জমিতে খুলনার পাইকগাছার নারী ঝর্ণা সরকারছবি: এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের সৌজন্যে

ভোরে ঘুম থেকে উঠে আম্বিয়া খাতুনের প্রথম চিন্তাই থাকত খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা নিয়ে। তাঁর বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে। আম্বিয়া এখনো ভুলতে পারেন না সেসব কষ্টের দিনের কথা। তিনি বলেন, আগে তাঁদের এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ছিল না। প্রতিদিন অনেক দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো। অনেক সময় পুকুরের অনিরাপদ পানিই ছিল একমাত্র ভরসা।

কষ্ট বেশি হতো শুকনো মৌসুমে। তখন পুকুরও শুকিয়ে যেত। আম্বিয়া বলছিলেন, ‘এমনও দিন গেছে যখন পানির অভাবে রান্না করা সম্ভব হয়নি। পানি আনার জন্য প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা হাঁটতে হতো। এতে শরীর খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ত এবং মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে যেতাম। আমার এই কষ্টের কারণে পরিবারকেও অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো।’

তবে সেই কষ্টের দিন এখন অতীত। আম্বিয়ার মতো অনেকেরই এখন পানি নিয়ে ভোগান্তি নেই। কারণ, তাঁর বাড়িতেই হয়েছে নিরাপদে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা—বাড়ির উঠানে দুই হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পানির আধার। এখন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সারা বছর নিরাপদ পানির একটি নির্ভরযোগ্য উৎস পেয়েছেন তিনি।

পানি আনতে আর প্রতিদিন দু–তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় না, এই অতিরিক্ত সময় আম্বিয়া এখন নিজের ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনমূলক কাজে ব্যয় করছেন। ২০২১ সালে জিসিএ প্রকল্প থেকে বসতবাড়ির আঙিনায় সবজিবাগান বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি নিজের উঠানে সবজি চাষ শুরু করেন। বর্তমানে লাউ, লালশাক, মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি সবজি উৎপাদন করছেন, যা তাঁর পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণে সাহায্য করছে এবং অতিরিক্ত সবজি তিনি প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করছেন।

জেন্ডার–রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (জিসিএ) প্রকল্পের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও জীবিকায়ন সহায়তা আম্বিয়ার মতো অনেকেরই জীবন বদলে দিয়েছে—স্বাস্থ্য, আয়, খাদ্যনিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সর্বশেষ ব্রাজিলের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে এই প্রকল্প পেয়েছে বৈশ্বিক সম্মান।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে জিসিএ প্রকল্প মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি সংস্থা এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ।

উপকূলে পানির জন্য নিত্য লড়াই

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানি পাওয়া দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও সীমিত অবকাঠামোর কারণে নারীদের প্রায়ই দূর থেকে পানি আনতে হয়। এতে সময়ের অপচয় এক নৈমিত্তিক ঘটনা উপকূলের অসংখ্য নারীর জীবনে। দূর থেকে পানি আনার পরিশ্রম কম নয়। এতে শরীরের ওপর বেশ প্রভাব পড়ে।

গবেষণায় দেখা যায়, উপকূলের অনেক এলাকায় পানির উৎসে লবণাক্ততার মাত্রা জাতীয় মানের চেয়ে অনেক বেশি। এসব এলাকায় টিউবওয়েল ও পুকুরের পানিতে ধাতব পদার্থ পাওয়া গেছে, যা নিরাপদ পানির মানদণ্ড অতিক্রম করে। ফলে এসব এলাকার মানুষ প্রায়ই নিরাপদ পানির অভাবে ভোগে।

আ ক্রস–সেকশনাল ভিউ অব দ্য ড্রিংকিং ওয়াটার সিনারিও ইন আ ক্লাইমেট–স্ট্রেসড সেটিং: কেস স্টাডি ফ্রম সাউথওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ’ গবেষণাটি মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় বাংলাদেশের খাওয়ার পানির সংকট, লবণাক্ততা, পানি সংগ্রহের সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ এবং নারীদের ওপর এর অসম প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। এটি ইউটিলিটিস পলিসি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে গবেষকেরা উপকূলের পাঁচটি পানি-সংকটাপন্ন উপজেলার ওপর গবেষণা করেন। গবেষণায় পানির মান, প্রাপ্যতা, সংগ্রহের কষ্ট, খরচ ও সামাজিক বৈষম্যের দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৬৫ মাস পর্যন্ত নিরাপদ পানি পাওয়া যায় না, যদিও অঞ্চলভেদে এ সময়ের তারতম্য রয়েছে। কিছু এলাকায় পানির সংকট সাত মাসের বেশি স্থায়ী হয়।

এ সংকটের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়ে নারীদের ওপর। গবেষণাটি দেখিয়েছে যে প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারী ও কিশোরীদের ওপর পড়ে। তাঁদের অনেক সময় দূরবর্তী উৎস থেকে পানি আনতে হয়, যা শারীরিক শ্রম, সময়ের অপচয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে অনেক পরিবারের নিজস্ব পানির উৎস নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব পানির উৎস আছে, ফলে অধিকাংশ মানুষকে বাইরের উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।

স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

সাতক্ষীরার পূর্ণিমা রানী দে (৪৫) একজন বিধবা। তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা ইউনিয়নে।  দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তিনি একাই থাকেন। তাঁর জন্য নিরাপদ পানি সংগ্রহ করা দৈনন্দিন কষ্টের অংশ ছিল। প্রতিদিন তাঁকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে যেতে হতো। অসুস্থ হলে বাধ্য হয়ে পুকুরের অনিরাপদ পানি পান করতে হতো, যা বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের কারণ।

উপকূলের নারীদের পানির জন্য এমন কষ্ট তাঁদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে স্বাভাবিকভাবেই। উপকূলজুড়েই এ পরিস্থিতি। গবেষণায় দেখা যায়, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং প্রজননস্বাস্থ্যের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ‘রিপ্রোডাকটিভ হেলথ চ্যালেঞ্জেস ইন কোস্টাল বাংলাদেশ: আ সাইলেন্ট থ্রেট অব ওয়াটার স্যালনিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। বিএমসি উইমেনস হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় এ গবেষণা।

গবেষণায় দেখা যায়, যেসব উত্তরদাতাকে নিরাপদ পানীয় পানি সংগ্রহের জন্য এক কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করতে হয়, তাঁদের মধ্যে নারীস্বাস্থ্যজনিত সমস্যার হার বেশি (৯৩.৩%)। এর তুলনায় যাঁদের এক কিলোমিটারের মধ্যে পানির উৎস রয়েছে, তাঁদের মধ্যে এ হার ৬০.৩%। 

তবে পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। সরকারি–বেসরকারি কিছু তৎপরতায় পানির কষ্ট দূর হচ্ছে কিছু এলাকায়। পূর্ণিমা রানীর বাড়িতেও জিসিএ প্রকল্পের সহায়তায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক স্থাপন করা হয়। এখন বাড়িতে নিরাপদ পানি আছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি কম এবং সময়ও বাঁচছে।

অতিরিক্ত সময় ব্যবহার করে পূর্ণিমা রানী নিজস্ব উঠানে সবজি চাষ শুরু করেছেন। উৎপাদিত সবজি খাদ্যচাহিদা পূরণে সাহায্য করছে এবং সেগুলো বিক্রি করে কিছু আয়ও হচ্ছে।

পূর্ণিমা বলেন, ‘আগে পানি আনতে ২ কিলোমিটার হাঁটতে হতো। অসুস্থ হলে পুকুরের পানি খেয়ে আরও অসুস্থ হতাম। এখন নিজের বাড়িতেই নিরাপদ পানি পাই। মনে হয় জীবনের বড় কষ্ট কমে গেছে।’

সমন্বিত পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন উপকূলের নারীরা
ছবি: এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের সৌজন্যে

প্রকল্পের বিস্তার ও প্রভাব

জিসিএ প্রকল্প ৬৫৮টি পাড়াভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং ১ হাজার ২০টি নারী জীবিকায়ন দল গড়ে তুলেছে। দলগুলো নিয়মিত বৈঠকে বাজার বিশ্লেষণ, আর্থিক পরিকল্পনা, উৎপাদন কৌশল ও দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়ে আলোচনা করে।

প্রকল্পের মাধ্যমে মোট আট ধরনের জীবিকায়ন পদ্ধতির আওতায় ২ হাজার ৬৭২টি জলবায়ু সহনশীল জীবিকার উপকরণ প্যাকেজ বিতরণ করা হয়েছে। জীবিকায়ন পদ্ধতিগুলোর মধ্যে এতে রয়েছে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ, হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে কৃষি, কাঁকড়া ও তিল চাষ, নার্সারি, মাছ ও কাঁকড়ার খাদ্য উৎপাদন এবং অ্যাকুয়াজিওপনিক পদ্ধতিতে একই জমিতে সমন্বিত মাছ ও সবজি চাষ।

জীবিকায়ন প্যাকেজের আওতায় দলভিত্তিক জমি ইজারার মাধ্যমে ভূমিহীন ও দরিদ্র নারীরাও কৃষি উৎপাদনে অংশ নিতে পারছেন। নিরাপদ পানি, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ নারীদের স্বনির্ভর ও শক্তিশালী করছে, এমন তথ্য জানান এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের পরিচালক (গবেষণা) আহসান হাবিব।

নারীর নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রতীক

খুলনার কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের ঘুগরাকাটি গ্রামের মাকসুদা খাতুন (৩১) বাড়ির আশপাশে পশুপালন ও সবজি চাষ শুরু করেছিলেন। কিন্তু লবণাক্ত মাটি ও পানির কারণে ফসলের উৎপাদন হয়নি। দীর্ঘ সময় তিনি হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটান। এখন তাঁর জীবন বদলে গেছে। নিজেকে পরিচয় দেন সোজাসাপটা ভাষায়, ‘আমি একজন সিঙ্গেল মা। স্বামী চলে যাওয়ার পর সব দায়িত্ব একাই বহন করছি। একসময় ভেবেছিলাম হয়তো মেয়েকে পড়াতে পারব না।’

মাকসুদা ২০২১ সালে জিসিএ প্রকল্পে যুক্ত হন। প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের অর্থায়নে, জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন কর্মসূচি–ইউএনডিপির কারিগরি সহায়তায় এবং এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের মাধ্যমে
বাস্তবায়িত হচ্ছে।

মাকসুদা নেতৃত্ব দেন ‘গোলাপ’ নামে ২৬ সদস্যের নারী জীবিকায়ন দলে। এখানে তাঁরা হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষ, কাঁকড়া চাষ, তিল চাষ, নার্সারি এবং অ্যাকুয়াজিওপনিক পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি উৎপাদন শিখেছেন। হাইড্রোপনিক পদ্ধতির চাষে মাটির প্রয়োজন হয় না। প্রতিকূল আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে চাষ স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। এ পদ্ধতি লবণাক্ত এলাকার জন্য উপযোগী।

বৈশ্বিক স্বীকৃতি

মাকসুদা, পূর্ণিমা ও আম্বিয়ার জীবন আলাদা হলেও তাঁরা প্রকৃতপক্ষে একটি বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। সেটি হলো নিরাপদ পানি, প্রশিক্ষণ ও জীবিকাসহায়তা জীবন বদলাতে পারে।

শুধু পানির কষ্ট লাঘব নয়, নারীরা যেন আর্থিকভাবে সক্ষম হন, সেই বিবেচনা করেই জিসিএজিসি প্রকল্পের শুরু বলে জানান এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের নলেজ ম্যানেজমেন্ট কর্মসূচি কর্মকর্তা ডানা শিকদার। তিনি বলছিলেন, ‘সুপেয় পানি উপকূলের নারীদের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এর পাশাপাশি দারিদ্র্যও আছে। দুটোই যাতে একত্রে লাঘব হয়, সেই বিবেচনা থেকে আমরা কাজ শুরু করেছি। ধীরে ধীরে এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে।’

মাকসুদা বলছিলেন, ‘নিরাপদ পানি ও প্রশিক্ষণ আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। নিরাপদ পানির সুবিধা, সময় বাঁচানো এবং উৎপাদনমূলক উদ্যোগ আমাদের মতো নারীর জীবনে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।’

২০২৫ সালে দ্য গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) লোকাল অ্যাডাপটেশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ড পায় ইউএনডিপির অর্থায়নে পরিচালিত জিসিএ প্রকল্পটি। বিশ্বের ২০টি উদ্যোগের মধ্যে উপকূলের এই উদ্যোগকে ব্রাজিলে নভেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে সম্মানিত করা হয়। এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের পরিচালক (গবেষণা)  আহসান হাবিব বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য বড় একটি সম্মানের বিষয়।’