এমপি নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর জামিনের পক্ষে ‘আপসনামায়’ যা লিখেছেন দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় কারাবন্দী সাতক্ষীরার সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম জামিন পেলে তাঁদের আপত্তি নেই বলে একটি আপসনামায় উল্লেখ করেছেন মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ। ওই আপসনামা আজ বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে আদালত সেটি গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী।
আপসনামার বিষয়ে মরিয়মের বাবা ও মামলার বাদী মাসুম বিল্লাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পিপি ওমর ফারুক ফারুকী জানিয়েছেন, মামলার বাদী মাসুম বিল্লাহর উপস্থিতিতেই আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে এই আপসনামা উপস্থাপন করেছেন।
গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়। পরে ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলাম জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন।
২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়। ওই রাতেই গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে গাজী নজরুল ইসলাম, মাকছুদা ইসলাম ও নিহত মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, গাজী নজরুলের সঙ্গে বিয়ের পর থেকে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা তাঁদের জানিয়েছিলেন মরিয়ম।
এর মধ্যে এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গাজী নজরুল ইসলামের দুই দফায় আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। রিমান্ড শেষে গত সোমবার নজরুলকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। সে সময় আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে তিনি বলেছিলেন, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম ও প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলামের সঙ্গে ন্যাম ভবনে বসবাস করতেন গাজী নজরুল। প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে নিয়ে ন্যাম ভবনে বসবাস করাকালে মরিয়ম মাঝেমধ্যে নজরুলের শয়নকক্ষের পাশে ব্যালকনিতে (বারান্দায়) ঘুমাতেন। তা ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুলের কাছ থেকে মামলার ঘটনার বিষয়ে ‘আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ পাওয়া গেছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করেছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এই অবস্থার মধ্যে আজ নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদার জামিন আবেদনের শুনানি হয়। সেখানে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ প্রথম পক্ষ এবং গাজী নজরুলের নিকটাত্মীয় মো. আবদুল হামিদ মোড়ল দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে তৈরি করা আপসনামাটি দাখিল করা হয়। এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন মাসুম বিল্লাহ। তিনি আপসনামায় বলেছেন, আগে থেকেই গাজী নজরুল তাঁর নিকটাত্মীয় এবং গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা জামিন পেলে তাঁদের আপত্তি থাকবে না। আসামিরা জামিন পেলে তাঁরা হৃদ্যতাপূর্ণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে একান্তভাবে চেষ্টা করবেন।
ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে আজ গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের জামিন শুনানি হয়। আদালত বয়স ও নারী বিবেচনায় মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করেন জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেছেন, আদালত আপসনামা গ্রহণ করেননি। আপসনামা আদালত গ্রহণ করলে তো দুজনকেই জামিন দিতেন। এই মামলা আপসযোগ্য নয়।
আদালতে দাখিল করা ওই আপসনামার বক্তব্য তুলে ধরা হলো:
“আপোষনামা”
এস.এম মাসুম বিল্লাহ, প্রথমপক্ষ।
মো. আব্দুল হামিদ মোড়ল, দ্বিতীয়পক্ষ।
পরম করুনাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নাম স্মরণে অত্র আপোষনামা লেখা শুরু করিলাম।
(১) যেহেতু আমি প্রথমপক্ষের কন্যা মরিয়মের সহিত অত্র মামলার ১নং আসামি জি.এম নজরুল ইসলামের সহিত বিবাহ হয়। বিবাহ হওয়ার পরে জি.এম নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের সহিত আমার মেয়ে ১নং আসামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে তাহারা একত্রে সংসার জীবন পরিচালনা করিয়া আসিতেছিলেন।
(২) যেহেতু গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুপুর অনুমান ৩-৫:৩০ ঘটিকার মধ্যবর্তী যেকোন সময়ে ঢাকাস্থ নিজ বাসভবনে আমার কন্যা মরিয়ম আত্মহত্যা করিলে আমার মেয়ের জামাই জি.এম নজরুল ইসলামের ফোন পাইয়া তাহার বাস ভবনে আনুমানিক বিকাল ৬.৩০ ঘটিকার সময় উপস্থিত হইয়া আমার কন্যা আত্মহত্যার বিষয়ে জানিতে পারি।
(৩) যেহেতু আমার মেয়ের জামাই এর বাসায় আত্মহত্যার বিষয়টি সংঘঠিত হইয়াছে ফলে তাৎক্ষনিক ভাবে সন্দেহ বশতঃ আমার মেয়ের জামাই জি.এম নজরুল ইসলাম, তাহার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও অন্য একজনকে আসামী করিয়া শেরেবাংলানগর থানার মামলা নম্বর ১৬ (০৯) ২০২৬, ধারা: ৩০৬ দন্ডবিধি দায়ের করি।
(৪) যেহেতু উক্ত মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন মাধ্যমে অবগত হইয়াছি যে, আমার মেয়ের জামাই জি.এম নজরুল ইসলাম ও তাহার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের প্ররোচনায় কিংবা তাহাদের কোনো কার্যকলাপে রাগ বা অভিমানে আমার মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে নাই।
(৫) যেহেতু আমি ও আমার মেয়ের জামাই জি.এম নজরুল ইসলাম এবং দ্বিতীয়পক্ষ জনাব মোঃ আব্দুল হামিদ মোড়ল পূর্ব হইতেই নিকট আত্মীয় হওয়ায় উভয়পক্ষের আত্মীয়স্বজন উভয়েরই নিকটাত্মীয়। ফলে নিকট আত্মীয়দের সহায়তায় আলাপ আলোচনা করিয়া উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তি বিরাজিত থাকার লক্ষ্যে এবং উভয়পক্ষে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার স্বার্থে নিম্ন বর্ণিত শর্তে অত্র আপোষ নামায় উভয়পক্ষ সহি করিলাম।
শর্ত সমূহ
(ক) শেরে বাংলা নগর থানার মামলা নং-১৬ (৯) ২৬ ধারা: ৩০৬ দন্ডবিধিতে আসামী জি.এম নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলাম জামিন পাইলে আমি কিংবা আমার পরিবারের কারো কোনো আপত্তি নাই।
(খ) আসামীদ্বয় জামিন পাইলে উভয়পক্ষ হৃদ্যতাপূর্ণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখিয়া চলিতে একান্তভাবে চেষ্টা করিব।
(গ) বিচারাধীন বিষয়ে উভয়পক্ষ নির্লিপ্ত থাকিয়া বিচার কার্যে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করিব।