তবে ‘ভুয়া’ চিঠির খবর জেনেও গত দুই সপ্তাহে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করেনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বইটি এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্রি হয়েছে দেড় হাজার কপির বেশি। যে বইয়ের বাজারমূল্য ৯৬০ টাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তা কিনতে হয়েছে বইয়ের গায়ে দেওয়া মূল্য ১৩০০ টাকাতেই।

বইটি ও এর প্রকাশক

তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা বইটির লেখক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো. মাহমুদুর রহমান। লেখক হিসেবে যিনি ব্যবহার করতেন ড. আনু মাহ্‌মুদ নামটি। ৭০৪ পৃষ্ঠার এ বইয়ের প্রসঙ্গ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। ৬৫টি প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের ৩৬টি লেখা বিশিষ্টজনদের।

এর মধ্যে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনসহ দুজন লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানিয়েছেন, বইটি সম্পর্কে কিছুই শোনেননি তাঁরা। লেখা প্রকাশের জন্য কোনো অনুমতিও নেওয়া হয়নি। বইটিতে ভুল তথ্যের সঙ্গে আছে অসংখ্য বানান ভুলও। ভূমিকার প্রথম দুই পৃষ্ঠার ৬০০ শব্দের মধ্যে অন্তত ২২টি বানান ভুল রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে লেখা বইয়ের এমন অযত্নে প্রকাশ ও বিপণন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তাম্রলিপি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী এ কে এম তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘ক্ষমতাবান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপের মুখে অনেক সময় প্রকাশক বই করতে বাধ্য হন। বইটির বিপণনের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাম্রলিপির চুক্তি হয়।

সে অনুযায়ী প্রায় ৪৫ শতাংশ কমিশনে একবারে মূল্য দিয়ে বই কিনেছে এস বি কমিউনিকেশন নামের প্রতিষ্ঠানটি। তারাই বিপণনের ব্যবস্থা নিয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ইস্যুর সঙ্গে প্রকাশনীর কোনো সম্পর্ক নেই।’

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা কথিত ‌ভুয়া চিঠিটির অনুলিপিতেও উল্লেখ আছে এস বি কমিউনিকেশনের নাম।

প্রতিমন্ত্রীর চিঠি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য

প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের ‘স্বাক্ষর’সংবলিত চিঠির তারিখ গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ জুলাই জেলা শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বই কেনার অনুরোধপত্র পাঠিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সহকারী কমিশনার। ১৪ জুন চিঠি দিয়েছেন সিরাজগঞ্জের সহকারী কমিশনার।

সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ফারুক আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, ভুয়া চিঠি সন্দেহ হয়নি বলেই দ্বিতীয় চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। তবে কাউকে কিনতে বাধ্য করা হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি জেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, বছরজুড়েই এমন বইয়ের তালিকা আসতে থাকে। কখনো কখনো তহবিল পর্যন্ত থাকে না, কিন্তু বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানের অন্য তহবিল থেকে বই কিনতে হয়।

প্রতিমন্ত্রীর স্বাক্ষরসংবলিত বই কেনার চিঠি প্রসঙ্গে জানতে প্রথম আলো দেশের ১০টি জেলার তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নড়াইল, খুলনা, মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহ থেকে পাওয়া গেছে চিঠিটি। দুটি জেলা থেকে প্রাপ্তির কথা মৌখিকভাবে স্বীকার করলেও চিঠিটি দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। কোনো কোনো জেলা প্রশাসক অবশ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিটি পাননি বলে জানিয়েছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দীক প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি বই কেনার নির্দেশনা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্যরা দিতে পারে না। তবে অনুরোধপত্র যায় অনেক সময়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিবেচনা করতে হবে, বইটি আদৌ তাদের প্রয়োজন আছে কি না।

প্রতিমন্ত্রী বললেন, ‘এক দিন সময় দেন’

বইটি বিপণনের দায়িত্বে থাকা এস বি কমিউনিকেশনের এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বেরিয়ে আসে আরেক তথ্য। তাঁর দেওয়া সূত্র থেকে যোগাযোগ করা হয় ময়মনসিংহের আবু সালেহ মো. মুসা নামের স্থানীয় একজন সাংবাদিকের সঙ্গে। আবু সালেহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বইটি প্রধানমন্ত্রীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে লেখা দেখে উৎসাহিত হই।

বই বিক্রির সঙ্গে যুক্ত যুবকেরা কিছু টাকা পাবে, এটা ভেবে তাদের অনুরোধে প্রতিমন্ত্রীর কাছে যাই। তাঁর ময়মনসিংহের পণ্ডিতপাড়ার বাসায় গিয়ে অনুরোধ করি ডিও করে দিতে। প্রতিমন্ত্রী আমাকে তাঁর সহকারী একান্ত সচিব হাবিবুর রহমানের কাছে চিঠি রেখে আসতে বলেন। পরে স্বাক্ষর করা চিঠি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ডিও নম্বর মন্ত্রণালয় থেকেই পাঠানো হয়েছে।’

আবু সালেহ মো. মুসার এই বক্তব্যের পর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবারও যোগাযোগ করা হলে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জনসংযোগ কর্মকর্তা পুনরায় দাবি করেন, এটি ভুয়া চিঠি।

এর মধ্যে একটি সূত্র জানিয়েছে, বইটির বিক্রি আপাতত বন্ধ রাখার মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

প্রতিমন্ত্রী গত ১৫ সেপ্টেম্বর একবার মাত্র ফোন ধরেন। প্রথম আলোকে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এক দিন সময় দেন। আমি ব্যাপারটি দেখছি।’ এরপর আর প্রতিমন্ত্রী ফোন ধরেননি। গতকাল শুক্রবার রাতে তাঁর মুঠোফোনে কল করে ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

পুরো বিষয়টি জানিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, গবেষক ও প্রকাশক মফিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের গ্রন্থজগতে এবং গ্রন্থের পৃষ্ঠপোষকতায় যারা দায়বদ্ধ, এই বৃত্ত মিলে একটি যথেচ্ছাচার চালাচ্ছে। এই অনাচারে ক্ষমতাবান অনেকেই সংশ্লিষ্ট, ক্ষমতাহীনেরাও সুবিধা পেতে একে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা জাতি।’