দেশে সংস্কৃতির চর্চা এখন নিম্নতম স্তরে পৌঁছেছে

সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে; ৯ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: দীপু মালাকার

বাংলাদেশে সংস্কৃতির চর্চা এখন নিম্নতম স্তরে পৌঁছে গেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, কিশোরেরা মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে আটকা পড়ছে, তাদের কোনো সামাজিক জীবন নেই। এই অবস্থা বদলাতে দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণ প্রয়োজন।

সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব, কিশোর–তরুণেরা তুচ্ছ ঘটনায় মারামারিতে জড়িয়ে পড়াসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান হয়। এই আয়োজনে ‘একাদশ জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা ২০২৫’-এর বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়।

অনুষ্ঠানে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ। বাউলদের ওপর আক্রমণ আগেও হয়েছে, কিন্তু এখন যেভাবে হচ্ছে সে রকম আগে দেখা যায়নি।

ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের তুচ্ছ কারণে বারবার মারামারিতে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অথচ ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা ছিল মেধা-প্রতিভার উন্নয়নে, পড়ালেখা ও সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে। সাভারে দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কথাও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এখন কিশোরেরা গ্যাং গড়ে তুলে চাঁদাবাজি করে। অনেকে নানা রকম নিকৃষ্টতম অপরাধ ও কল্পনাতীত অপরাধে ব্যস্ত হয় এবং সেগুলোর মধ্যে বীরত্ব প্রকাশ করে। এই পরিস্থিতির জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয়, দায়ী গোটা ব্যবস্থা। এই অবস্থার পরিবর্তনের একটা সাংস্কৃতিক জাগরণ আনতে হবে। সেই জাগরণের প্রতীক হচ্ছে ত্বকী (তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী)।

সাহস, চিন্তা ও ভয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ত্বকীকে কেন হত্যা করা হয়েছে, এটা স্পষ্ট। ত্বকীর কোনো অপরাধ ছিল না। নারায়ণগঞ্জকে যারা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। তিনি সংস্কৃতিচর্চা করেন। এই দুটো কারণে শাস্তি দেওয়ার জন্য তাঁর কিশোর সন্তানটিকে হত্যা করা হয়।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ত্বকী। দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর, ইউসুফ হোসেনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব-১১। এর মধ্যে সুলতান শওকত ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত করছে র‍্যাব। তবে ১৫৪ মাসেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করতে পারে, কিন্তু করছে না। কারণ, তাদের করতে দেওয়া হচ্ছে না। এটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি এবং এই ব্যবস্থার কারণেই হচ্ছে না।

পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে অতিথিদের সঙ্গে বিজয়ীরা। রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে; ৯ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: প্রথম আলো

ত্বকীর ৩০তম জন্মবর্ষে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোরেরা যে ছবিগুলো এঁকেছে, সেগুলোর মধ্যে সাহস, চিন্তা ও ভয়—এই তিন অভিব্যক্তি দেখেছেন বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, আজকে কিশোরেরা যে দুর্দশার মধ্যে আছে, সেটা তুলনাবিহীন। এ রকম দুর্দশা, দুর্গতি ও বিপন্ন অবস্থায় কিশোরদের আগে কখনো দেখা যায়নি।

বক্তব্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ধরনের কাজ করে যাচ্ছেন, যে ধরনের অকপটে বলছেন যে আজকে এই দেশ দখল করব, ওইটা করব—সেগুলো পুরো পৃথিবী সহ্য করছে। জাতিসংঘ ভেঙে যাচ্ছে, সংঘবদ্ধ উদ্যোগগুলো ভেঙে যাচ্ছে।’

‘এখন বিচারে বাধা কোথায়’

অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার (জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত) পর ত্বকী হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে সেই বাধাটা আর নেই। এখন তো বিচার হবে। কিন্তু গত ১৫ মাসে সেই বিচার হয়নি এবং হতে বাধাটা কোথায়, সেটাও এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যারা ত্বকী হত্যার বিচারকাজে বাধা দিচ্ছে কিংবা ঠেকিয়ে রেখেছে বা হতে দিচ্ছে না, তাদের ভবিষ্যতে জবাবদিহির মধ্যে আসতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারকে শেখ হাসিনার সরকারের সম্প্রসারণ বললে খুব ভুল হবে না—এমন মন্তব্য করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ওসমান পরিবারের দখল, লুণ্ঠন, সন্ত্রাস এবং যথেচ্ছাচারের একটা সাক্ষী হচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদী। সেই ওসমান পরিবারের নেটওয়ার্ক ও জগৎটা এখন পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে আছে, সুবিধাভোগীরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এ কারণে তারা ওসমান পরিবারকে বিচারের সম্মুখীন করতে দিতে চায় না।

ত্বকী হত্যার বিচারে এখন বাধা কোথায়, সেই প্রশ্ন তুলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন অনুষ্ঠানে বলেন, মামলার অভিযোগপত্র এখনো কেন হচ্ছে না? কারা বাধা দিচ্ছে? অন্তর্বর্তী সরকার কেন এটাকে গুরুত্ব দিতে পারছে না? তিনি বলেন, ত্বকী হত্যা এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা ওসমান পরিবারের লোকেরা কেউ বহাল তবিয়তে পার্শ্ববর্তী দেশে, কেউ দুবাইয়ে বসে আছেন।

ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন কেন দেওয়া হচ্ছে না, এই প্রশ্ন তোলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। তিনি বলেন, দুই মাস পর ত্বকী হত্যার ১৩ বছর হবে, কিন্তু এখনো অভিযোগপত্র হলো না। শেখ হাসিনার আমলে রাজনীতির প্রয়োজনে বেছে বেছে বিচার করা হতো, অন্য মামলাগুলো ধামাচাপা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হতো। হাসিনার সেই ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব হালিম আজাদ, প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক জাহিদুল হক ও প্রতিযোগী দেবশ্রিতা পাল বক্তব্য দেন।

ত্বকীর মা রওনক রেহানা মঞ্চে থাকলেও তিনি বক্তব্য দেননি। অনুষ্ঠানের আলোচনা পর্ব শেষে তিনটি বিভাগে ৬০ জন প্রতিযোগীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনু মুহাম্মদ, সারা হোসেনসহ অতিথিরা।